ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) সমাজকল্যাণ বিভাগের সভাপতি আসমা সাদিয়া রুনা (৩৫) হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত ও দ্রুত বিচার নিশ্চিত সহ তিন দফা দাবিতে শোক ও মৌন মিছিল করেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা।
মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) দুপুর ১২ টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের থিওলজি অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ অনুষদ ভবনের সামনে থেকে মৌন মিছিল বের হয়। মিছিলে শিক্ষকদের সাথে সাধারণ শিক্ষার্থীরাও বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড হাতে অংশগ্রহণ করে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করেন।
মৌন মিছিল শেষে থিওলজি অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ অনুষদ ভবনে সমবেত হয়ে সংক্ষিপ্ত প্রতিবাদী সমাবেশ করেন তারা।
গত ৪ মার্চ বিকেলে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজ দপ্তরে ছুরিকাঘাতে সমাজকল্যাণ বিভাগের সভাপতি ও সহকারী অধ্যাপক আসমা সাদিয়া রুনা নিহত হন। একই সময় রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের কর্মচারী ফজলুর রহমানকে (৩৫) ওই কক্ষ থেকে গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। একই দিন গভীর রাতে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থানায় আসমার স্বামী মুহা. ইমতিয়াজ সুলতান একটি হত্যা মামলা করেন। এজাহারে তিনি উল্লেখ করেন, বিভাগের দুই শিক্ষক ও এক কর্মকর্তার দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা ও নির্দেশে কর্মচারী ফজলুর রহমান তাঁর স্ত্রীকে হত্যা করেন। মামলায় অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদেরও আসামি করা রয়েছে। এক মাস পার হলেও অভিযুক্তদের গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি। এনিয়ে ক্ষুব্ধ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ও নিহতের পরিবার।
শিক্ষকদের হাতে ব্যানার এবং শিক্ষার্থীদের হাতে প্রতিবাদী
প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন করেন। প্ল্যাকার্ডে “বিচারহীনতা চর্চা বন্ধ করো; নিরপেক্ষ তদন্ত চাই, প্রভাবমুক্ত বিচার চাই; আসমা সাদিয়া রুনা হত্যার বিচার চাই; হত্যার বিচার না হলে নিরাপত্তা কোথায়; শিক্ষকের নিরাপত্তা রাষ্ট্রের দায়িত্ব; সাজিদ হত্যার বিচার চাই; নৃশংস হত্যাকাণ্ডের দ্রুত বিচার নিশ্চিত করো” সহ ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা নিশ্চিত সংক্রান্ত বিভিন্ন উক্তি দেখতে পাওয়া যায়।
এসময় সমাবেশে ৩ দফা দাবি উত্থাপন করেন শিক্ষকরা। তাদের দাবি সমূহ হলো— হত্যাকাণ্ডের নিরপেক্ষ তদন্ত করা, অপরাধীদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া এবং শিক্ষাক-শিক্ষার্থী-সহ সকলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
প্রতিবাদ সমাবেশে আল-হাদিস অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. মুজাহিদুর রহমান বলেন, “সাদিয়া রুনার অফিসে কী ঘটতো, সব আপডেট তাঁর স্বামীর কাছে ছিল। এর প্রেক্ষিতেই কিন্তু মামলাটি হয়েছে। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভাগগুলোতে কোনো আর্থিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নাই। একজন চেয়ারম্যান, প্রভোস্ট ও স্টেকহোল্ডার নামমাত্র হিসাব দিয়ে চলে যান; এটার কোনো অডিট ও জবাবদিহি হয় না— এটাই বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস্তব চিত্র।”
অধ্যাপক বলেন, “তিনি (শিক্ষিকা রুনা) যখন নৈতিকতার প্রশ্নে, আর্থিক স্বচ্ছতার প্রশ্নে এটাকে একটা জবাবদিহিতার মধ্যে আনতে চাইলেন, তখনই উনার উপরে এই বর্বরচিত এই যে ঘটনা ঘটালো, উনাকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হলো। বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষের কাছে কিন্তু উনি আগেই জানিয়েছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ যদি এটাকে আরও গুরুত্ব সহকারে আগেই যদি ব্যবস্থা নিতেন, তাহলে হয়তো তার জীবনটা রক্ষা পেত।”
বাংলা বিভাগের অধ্যাপক গাজী মো. মাহবুব মুর্শিদ বলেন, “এ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টেকহোল্ডার— বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, দায়িত্বরত শিক্ষক এবং অন্যান্য পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ আছেন— তাদের কাছ থেকে আমরা আরও বলিষ্ঠ পদক্ষেপ আশা করেছিলাম। বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক ও ছাত্র হত্যা হয়েছে সেগুলো আমরা দেখেছি। কর্মকর্তা কর্মচারীও যদি হন, আমরা মনে করি প্রত্যেকেরই উচিত তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জারি রাখা— অন্যায়কে অন্যায়ই বলা। সাদাকে সাদা এবং কালোকে কালো বলার যে সংস্কৃতি আমরা গড়ে তুলতে পারিনি, এটাই হচ্ছে তার প্রতিফল। আমাদের আজকের এই কর্মসূচির ফলে কর্তৃপক্ষ নিশ্চয়ই ইনসাফ নিশ্চিত করবেন বলে আশা করি।”
তিনি আরও বলেন, “ন্যূনতম সময় নিয়ে সঠিক তদন্তের মধ্য দিয়ে অপরাধী যারা থাকবেন ও যিনি যেই থাকুক, তাকে যেন বাঁচানোর চেষ্টা না করা হয়। কাউকে অন্যায়ভাবে যেন ফাঁসানো না হয়, কাউকে আবার বাঁচানোর চেষ্টাও না করা হয়। সঠিক তদন্তের মধ্য দিয়ে দ্রুততার সাথে এটার একটা সঠিক বিচার এবং এই রুনার পরিবার কিন্তু এখনো পর্যন্ত তারা আর্থিক একটা ন্যূনতম সহযোগিতাও পাননি। বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছ থেকে যে তার সাপোর্ট, সে সাপোর্টটাও আমরা অনুরোধ করি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে, তার চারটি সন্তানসহ ওই পরিবারের দিকে তাদের আরও মনোযোগী হবেন তারা। এ বিষয়ে তারা দ্রুত পদক্ষেপ নেবেন এবং আমরা একটা সঠিক বিচার পাবো, ইনসাফ হবে এবং ভবিষ্যতে এর মধ্য দিয়েই এ জাতীয় অন্যায় এবং অবিচার এর পথ রুদ্ধ হবে।”
আজকালের কন্ঠ/আর বি