Header
প্রিন্ট তারিখঃ সেপ্টেম্বর ২০, ২০২৬ , ৮:৩৭ অপরাহ্ণ | প্রকাশের সময়ঃ মার্চ ৮, ২০২৬ , ১১:১২ পূর্বাহ্ণ

সমতা ও সম্মানের সমাজ গড়তে নারীর অগ্রযাত্রা জরুরি: রিশিতা চাকমা

লেখকঃ রাবিপ্রবি প্রতিনিধি

আজ ৮ মার্চ, বিশ্বব্যাপী পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক নারী দিবস। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও নানা আয়োজনে দিনটি পালন করা হচ্ছে। নারীদের প্রতি অন্যায়, বৈষম্য ও সহিংসতার বিরুদ্ধে সচেতনতা সৃষ্টি করাই এই দিবসের মূল লক্ষ্য। এবারের প্রতিপাদ্য –

“আজকের পদক্ষেপ, আগামীর ন্যায়বিচার
সুরক্ষিত হোক নারী ও কন্যার অধিকার”।

আন্তর্জাতিক নারী দিবস সারা বিশ্বে নারীত্বের একটি মহান উদ্‌যাপন। এই দিনটি বিশেষ করে নারীদের কৃতিত্বকে সম্মান করে এবং লিঙ্গ বৈষম্য সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ায়। মেয়েদের শিক্ষার প্রসার ঘটানো এবং সমাজের সকল অংশ থেকে লিঙ্গ বৈষম্য দূর করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সেই লক্ষ্যকে সামনে রেখে আমরা কথা বলেছি রাঙ্গামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহকারী অধ্যাপক রিশিতা চাকমা এর সাথে। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন ‘দৈনিক আজকালের কন্ঠ’ এর প্রতিনিধি আদিত্য চৌধূরী।

প্রশ্ন: আপনার জন্ম, বেড়ে ওঠা এবং শিক্ষাজীবনের সেই দিনগুলোর গল্প দিয়ে যদি শুরু করি— যা আজকের আপনাকে এই পর্যায়ে নিয়ে এসেছে।

রিশিতা চাকমা: আমার জন্ম, বেড়ে ওঠা এবং শিক্ষাজীবনের শুরু এই প্রাণের শহর রাঙ্গামাটিতেই। ছোটবেলা থেকেই সম্প্রীতি ও বিশালতার পরিবেশে বড় হয়েছি এখানে, এটাই আমার মূল ভিত্তি সামনের দিনগুলোর জন্য। আমার শিক্ষাজীবন শুরু করেছি রাঙ্গামাটিস্থ সেন্ট ট্রিজার্স স্কুলে,তারপর লেকার্স পাবলিক স্কুল, তারপর রাঙ্গামাটি সরকারী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিকের ধাপ শেষ করি। এই ছোট শহরে তিনটি স্কুলের তিন ধরনের পরিবেশ; শত শত নতুন মুখ আমাকে অনেক কিছু শিখিয়েছে যা আজও আমাকে ব্যক্তিগত ও কর্ম জীবন গঠনে সহায়তা করছে। এরপর হলিক্রস কলেজ আমার কাছে আরও এক বিশাল বইয়ের পাতা; কলেজ গেইটে ঢুকার সাথে সাথেই যেন অনুভূত হয় শিহরণ। কড়া নিয়মানুবর্তী জীবনও যে অদ্ভুত এক সৌন্দর্যের রঙে রঙিন হতে পারে সেটা সেই পরিবেশে না গেলে হয়তো বুঝা যাবেনা। মানবতা, মানসিক দৃঢ়তা, অভিযোজন ক্ষমতা – সর্বোপরি এ যেন নতুনভাবে আত্মজা হওয়া। এরপর চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশালত্বও অনেক কিছু শিখিয়েছে যা আজকের এই কর্মজীবনের পথে সহায়ক। আমি মনে করি জীবনের প্রতিটি ধাপের জীবন ও বাস্তবমুখী শিক্ষা নিয়েই আজকের আমি।

প্রশ্ন: শৈশব মানেই একরাশ স্মৃতি। একজন নারী হিসেবে ফেলে আসা দিনগুলোর এমন কোনো বিশেষ মুহূর্ত কি আছে, যা আজও আপনাকে শত কর্মব্যস্ততার মাঝেও আন্দোলিত করে তোলে?

রিশিতা চাকমা: শৈশবের স্মৃতি তো আসলে অনেক মধুর। তখন ভালোমন্দ বিবেচনার এত জ্ঞান ছিলনা যে কোনটি শিক্ষনীয় ছিল সেটা বুঝার। কিন্ত আমি খুব স্মৃতিকাতর মানুষ; আমার খুব ছোট কালের অনেক স্মৃতি আজও মনে আছে, এমনকি কেজি স্কুলের এসেম্বলি লাইন ও! আমার তো ছোট বেলার বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবনেও সেটার ধারাবাহিকতার স্মৃতি গুলো, বন্ধুদের সাথে কাটানো দিনগুলো আজও খুব জীবন্ত লাগে নিজের কাছে। তখন ছিল না এত জীবনমুখী চিন্তা, যা করতাম মনের খোরাকের জন্যই করা হতো। এই ক্ষেত্রে একজন মেয়ে/ নারী হিসেবে আমি ছোটবেলা থেকেই বিভিন্ন জায়গায় পজিটিভলি মূল্যায়িত হয়েছি বলে আমি মনে করি।

প্রশ্ন: একজন নারীর সাফল্যের শিখরে পৌঁছানোর পেছনে কোন বিষয়গুলো প্রধান শক্তি হিসেবে কাজ করে বলে আপনি মনে করেন? এক্ষেত্রে পরিবারের সমর্থন একজন নারীকে কতটা আত্মবিশ্বাসী করে তোলে?

রিশিতা চাকমা: একজন নারীর সাফল্যের পেছনে আসলে পারিপার্শ্বিক পরিবেশ একটি খুব ভালো ফ্যাক্টর। পরিবার হলো প্রধান চালিকাশক্তি, কিন্তু এটি কারো গন্তব্যে পৌঁছানোর একমাত্র ফ্যাক্টর নয়। চারপাশের পরিবেশ সহায়ক হোক বা না হোক, একজনকে মানসিকভাবে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হতে হয়। আমার ক্ষেত্রে, এখন পর্যন্ত আমি সবচেয়ে ভালো সমর্থন পেয়েছি বলে অনুভব করি; কিন্তু যাদের সেই সমর্থন মিলছে না, আমার মনে হয় সেই ক্ষেত্রে তারা নিজেরাই নিজেদের প্রধান সঙ্গী। এই ক্ষেত্রে, মানসিক শক্তি গড়ে তুলতে পরিবারই সর্বাত্মক সমর্থনকারী।

প্রশ্ন: প্রত্যেক সফল মানুষের পেছনেই অনুপ্রেরণার একটি বড় উৎস থাকে। আপনার আজকের এই অবস্থানে আসার পেছনে বাবা-মা এবং পরিবারের ভূমিকা এবং তাঁদের আদর্শ আপনাকে কীভাবে প্রভাবিত করেছে?

রিশিতা চাকমা: প্রথমত, নিজেকে আমি সফল বলব না, সেটা অনেক বড় ব্যাপার। শুধু এটুকু বলব, আমি আজকে যতটুকু পেরেছি বা যেখানে আছি, এখানে আসার পিছনে আমার বড় অনুপ্রেরণা আমার পরিবার, আমার শিক্ষকরা এবং আরও আমার আশেপাশের অনেকেই আছেন যাদের আমি মন থেকে স্মরণ করি। আমি যদি কখনো ভুলও করে থাকি, তাহলে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখে তারা আমাকে সাহায্য করেছেন যাতে সামনে ভালোটা বেছে নিতে পারি এবং ভালো কাজটা করতে পারি। আমার উপর বিশ্বাস রেখেছেন, আমাকে আশীর্বাদ করেছেন, দোয়ায় রেখেছেন, আমি আসলেই সবার প্রতি কৃতজ্ঞ এবং তাদের এই বিশ্বাস, ভালোবাসা, আদর্শ ও শিক্ষাই আমার অনুপ্রেরণা।

একটা উদাহরণ যদি দেই, শুধু আমরা দুই বোন এবং আমাদের কোনো ভাই নেই। কিন্তু কিছু কিছু সমাজে এটা আনএক্সসেপ্টেবল এবং ভয়াবহ মনে করা হয় যে কোনো ছেলে নেই! কিন্তু আমার পরিবারে অন্তত আমি কখনো এই পার্থক্যটা অনুভব করিনি। এর কারণ আমার বাবা-মা এবং আমার পরিবার এটাকে কোনো বিষয় হিসেবে না ভেবে আমাদেরকে সমানভাবে দেখেছেন। আর আমাদের ছোটখাটো কোনো অর্জন হলেও সেটাকে অনেক বড় করে সেলিব্রেশন হোক বা এপ্রিসিয়েশন, সবই করেছেন। এটা আমার জন্য সত্যিই একটি আশীর্বাদ।

প্রশ্ন: পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা একটি অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ পেশা। এই ক্যরিয়ার বেছে নেওয়ার শুরুর দিকের গল্পটা কেমন ছিল? কোন তাড়না থেকে আপনি এই মহান পেশায় যুক্ত হলেন?

রিশিতা চাকমা: আমি কেন জানি না, ছোটবেলা থেকেই একটি বিষয়ে একটু দৃঢ় ছিলাম। আমি যে বিষয়েই পড়ি বা পড়ব, অন্তত আমি যেন সেই ঐতিহ্য বজায় রাখতে পারি। প্রকৌশল নিয়ে পড়া আমার ব্যক্তিগত পছন্দ ছিল এবং সেখানে গিয়েই আমি মনে মনে স্থির করি যে যদি আমার লক্ষ্য শিক্ষাদানের দিকে দিই, তাহলে আমি আমার স্বাচ্ছন্দ্যের জায়গায় থাকতে পারব। তারপর সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী হয়তো পুরোটা পূরণ করতে পারিনি, কিন্তু আমি চেষ্টা করেছি যাতে আমার লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারি। আমার বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষাজীবন আমার নিজের জন্য এক অনুপ্রেরণা। কারণ শুরুতে আমি প্রস্তুত হতে পারছিলাম না কোথা থেকে এবং কীভাবে আগাবো! সেখানে আমি আমার বন্ধুদের সহযোগিতায় সেটা অনেকটাই অতিক্রম করতে পেরেছি, যে ব্যাপারে আমার শিক্ষকরাও প্রশংসা করেছেন এবং আমাকে উত্তম পথ দেখিয়েছেন।

পড়াশোনা শেষ করেই আমি অন্য কোনো চাকরির চেষ্টা করিনি; শুধু শিক্ষাদানের ক্ষেত্রেই চেষ্টা করেছি। আর আমার কর্মজীবনের প্রথম শুরুই হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানো দিয়ে। আর রাঙ্গামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় আমার তৃতীয় কর্মস্থল।

প্রশ্ন: সাফল্যের পথ কখনোই মসৃণ হয় না। আপনার এই দীর্ঘ পথচলায় কোনো বিশেষ সামাজিক বা পেশাগত বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছে কি? সেই প্রতিকূলতা আপনি কীভাবে জয় করেছেন?

রিশিতা চাকমা: আরও একবার বলি, সফলতা শব্দটি অনেক বিশাল এবং সেখানে পৌঁছাতে এখনো অনেক পথ পাড়ি দেওয়া বাকি। কিন্তু নিজের পছন্দের পেশা বেছে নেওয়া এবং সেটিকে ধরে রাখার জন্য আসলে নিজের মানসিক শক্তিটা খুব দরকার। চারপাশে তো অনেক প্রতিকূলতা থাকবেই—এটাই স্বাভাবিক; কিন্তু সেটাকে সঙ্গে নিয়ে চলাটাই মূল সমন্বয়। পাশাপাশি অনেকেই মনে করেন যে হয়তো বাধ্য হয়ে এই পেশা নেওয়া, বা নারীদের জন্য এই পেশা বেশি সহায়ক—এ ধরনের অনেক কথা বলা হয়। কিন্তু আসল সত্য হলো, যেটা অন্যের কাছে ঐচ্ছিক, সেটা হয়তো আপনার কাছে লক্ষ্য বা পছন্দ। তার পাশাপাশি এটাও মনে রাখতে হবে, যেখানে একটি ছোট পরিবারেই আমরা সব সময় সবার মন রক্ষা করতে পারি না, সেখানে কারো একার পক্ষে সমাজ থেকে শুরু করে কর্মক্ষেত্র পর্যন্ত সবার মন রক্ষা করা সম্ভব নয়। তাই এটা মেনে নিয়েই নিজের স্বকীয়তা বজায় রেখে সামনে এগিয়ে যেতে হবে। আর এই ক্ষেত্রে আমি সৌভাগ্যবান যে আমি আমার সহকর্মী থেকে শুরু করে আমার আশেপাশের সবার সহযোগিতা পেয়েছি এবং পাচ্ছি। তাই আমি সবার কাছে সত্যিই কৃতজ্ঞ।

প্রশ্ন: ব্যস্ত কর্মজীবনের বাইরে নিজের জন্য সময় বের করা নিশ্চয়ই কঠিন। আপনার অবসর কাটে কীভাবে? শিক্ষকতার বাইরে আপনার শখ বা সৃজনশীল কাজের জগৎ সম্পর্কে জানতে চাই।

রিশিতা চাকমা: আমি নিজের জন্য সময় বের করে নেওয়ার চেষ্টা করি যেকোনোভাবে, কারণ এটা দরকার, নিজের জন্যই খুব দরকার। তবে খুব একটা অবসর পাই না। শুধু সময় বের করা, যেটাকে বলা যায় সেটুকু সময় বের করেই আমি ঘুরতে খুব পছন্দ করি এবং নতুন জিনিস জানতে ও খুঁজে দেখতে পছন্দ করি। আমার পড়ানোর বাইরে আমার একটি ব্যক্তিগত জগৎ আছে। সেখানে আমি কিছু সৃজনশীল কাজ করতে পছন্দ করি, যেমন—গান গাওয়া, ছবি আঁকা এবং রান্না করা। তবে সেগুলো একান্তই প্রয়োজন বা মনের খোরাকের জন্য।

প্রশ্ন: আন্তর্জাতিক নারী দিবসকে সামনে রেখে নারীর ক্ষমতায়ন ও বর্তমান প্রেক্ষাপট নিয়ে আপনার বিশেষ কোনো বার্তা বা ভাবনা আছে কি?

রিশিতা চাকমা: আন্তর্জাতিক নারী দিবস আসলে শুধু একটি বিশেষ দিনকে কেন্দ্র করে নারীদের মূল্যায়ন করা এবং উদযাপন করা। কিন্তু আমি মনে করি, বছরের প্রতিটি দিন যেন এটা মনে রেখে সেটাকে লালন করা হয়। এবারের আন্তর্জাতিক নারী দিবসের প্রতিপাদ্য “Give to Gain”—যার সারকথা হলো, আমরা যদি নারীদের সামনে এগিয়ে যেতে সহায়তা করি, সুযোগ দিই, তাহলে আমাদের সমাজ ও পৃথিবী আরও এগিয়ে যাবে এবং আরও শক্তিশালী হবে। আমার ভাবনাটাও একই—আমরা যদি আমাদের চারপাশের মানুষকে সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য সহায়তা করি, সেই পরিবেশ তৈরি করি এবং একসাথে পথ চলি, পরস্পরকে সম্মান করি, তাহলেই আমরা আরও উন্নত হব এবং সামনের দিনগুলোতে আরও প্রভাবশালী অবদান রাখতে পারব।

পৃথিবীর সকল কন্যা ও নারীর জন্য আমার শুভকামনা। আমি সবার নিরাপত্তা ও সমতা কামনা করি এবং সবার স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে এই দিনের মূল ভাবনা যেন সামনে এগিয়ে যেতে সহায়তা করে এই কামনা করি। সবাইকে আমার পক্ষ থেকে নারী দিবসের শুভেচ্ছা।

আজকালের কন্ঠ/আর বি

প্রিন্ট করুন