আর সব দিনের মতোই গতকাল রোববার মাগরিবের নামাজ পড়তে বাসা থেকে বেরিয়েছিলেন মো. বদির উদ্দিন (৭৬)। ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরায় তাঁকে ভবনের মূল ফটক ধরে ভেতরে ঢুকতেও দেখা গেছে। বাজছিল মুঠোফোনও। শুধু তাঁকে পাওয়া যাচ্ছিল না। এরপর প্রায় ২০ ঘণ্টা পর লিফটের ফোকর থেকে বদির উদ্দিনের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়।
সোমবার লিফটের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের সময় কর্মীরা দেখতে পান লিফটের ফোকরে বদির উদ্দিন পড়ে আছেন। ওখান থেকে তাঁর মুঠোফোনটি উদ্ধার হয়। খবর পেয়ে মিরপুর মডেল থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে আসে। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি)র ক্রাইম সিন ইউনিটও হাজির হয়। ময়নাতদন্ত ছাড়া মৃতদেহ হস্তান্তর করতে চাইছিল না পুলিশ। তাদের যুক্তি ছিল, এ নিয়ে পরে প্রশ্ন উঠতে পারে।
পরে পরিবারের সদস্যদের সবাই থানায় যান এবং পুলিশকে বোঝাতে সক্ষম হন যে এটি দুর্ঘটনা ছিল। তাঁরা বিনা ময়নাতদন্তে মৃতদেহ দাফন করতে চান। সোমবার রাত ৮টার পর বদির উদ্দিনের মৃতদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করে পুলিশ।
কিন্তু এনিয়ে অনেকেই সোশ্যাল মিডিয়াই নানা রকম সমালোচনা করছেন।
কাউসার আহমেদ নামে একজন লিখেছেন, লিফট ফাঁক থাকে কিভাবে ? এবং এক ইঞ্চি ও ফাক থাকার কথা না ! আর গেপ থাকলেও সেটা কত বড় যে একটা বয়স্ক মানুষ পড়ে গেলো ! এটা কিভাবে সম্ভব ! এটা কি লিফট নাকি মৃত্যুফাঁদ ? যে কোম্পানী এই লিফট বসিয়েছে তাদের নামে মামলা হওয়া উচিৎ।
শেখ আবুল কালাম নামে একজন লিখেছেন, এটা লিফটের যান্ত্রিক ত্রুটির কারনে হয়েছে, লিপ্ট নির্দিষ্ট তলায় পৌছানোর পুর্বেই যদি ঐফ্লোরের দরজা খুলে যায়, তখন লিপ্ট এসেছে ভেবে বা বেখেয়ালে ভিতরে পা দিলে নিচে পরে এমন দূর্ঘটনা ঘটে।
জাহিদ হাসান নামে একজন লিখেছেন, দু:খজনক। ঢাকা শহরের অনেক এপার্টমেন্টেরই লিফট এর নিয়মিত সার্ভিসিং করানো হয়না। কোন দুর্ঘটনা ঘটলে টনক নড়ে।
সাকিব চৌধুরী নামে একজন লিখেছেন, লিফটের গেপ কত বড় যে ওটা দিয়ে পড়ে গেলো। মালিক পক্ষ এর বিরুদ্ধে মামলা করা উচিত যে কেনো এরকম লিফট ব্যবহার কারী দের উদ্দেশ্যে খোলা রাখলো
ঘটনাটি ঘটেছে রাজধানীর মিরপুর ১০ নম্বর এলাকায়। মিরপুর মডেল থানার উপপরিদর্শক শ্রীদাম চন্দ্র হাওলাদার ঘটনার তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।
মো. বদির উদ্দিনের স্বজন আরিফ ইফতেখার উল ইসলাম বলেন, পরিবারের সদস্যদের অনুরোধে সোমবার রাত ৮টার দিকে ময়নাতদন্ত ছাড়াই বদির উদ্দিনের মৃতদেহ হস্তান্তরে রাজি হয়েছে থানা-পুলিশ। জানাজার পর আজই বদির উদ্দিনকে নিয়ে স্বজনেরা ঠাকুরগাঁওয়ে তাঁর গ্রামের বাড়িতে রওনা দেবেন।
জানতে চাইলে আরিফ বলেন, মো. বদির উদ্দিন মিরপুর ১০ নম্বরের একটি ১০তলা ভবনের পাঁচতলায় তাঁর মেয়ের কাছে থাকতেন। গতকাল মাগরিবের নামাজ পড়তে বাসা থেকে বের হন। সিসি ক্যামেরার ফুটেজে তাঁকে প্রতিবেশীর সঙ্গে ভবনের মূল ফটক পেরিয়ে ঢুকতেও দেখা গেছে। এরপর থেকে আর খোঁজ ছিল না। ওই প্রতিবেশী ভবনের চারতলায় থাকেন।
তিনি জানান, লিফটের ৫-এ নামবার কথা থাকলেও ভুলবশত বদির উদ্দিন লিফটের ৪-এ নেমে পড়ার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। তখন তিনিই (প্রতিবেশী) মনে করিয়ে দেন যে মো. বদির উদ্দিন ভুল করছেন। তখন বদির উদ্দিন আবারও ফিরে যান। কিন্তু তিনি আর লিফটে উঠতে পেরেছিলেন নাকি ফাঁক গলে পড়ে গেছেন, সেটা দেখতে পাননি। এরপর থেকে পরিবারের লোকজন মো. বদির উদ্দিনের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেন। ফোন বাজতেও শোনেন। কিন্তু কারও সাড়া পাননি। তাঁর নাতিরা নানা নিখোঁজ জানিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানুষের সহযোগিতা চান। আত্মীয়স্বজনের বাসায় খোঁজাখুঁজি ও থানায় সাধারণ ডায়েরিও করেন।
সংশ্লিষ্ট থানার উপপরিদর্শক শ্রীদাম চন্দ্র হাওলাদার বলেন, মো. বদির উদ্দিনের কানের পাশে আঘাত লেগে মারাত্মক রক্তক্ষরণ হয়। পরিবারের সদস্যরা তাঁকে জানিয়েছেন, ছেলেমেয়েদের ছোট রেখে বহু বছর আগে তাঁর স্ত্রী মারা যান। এরপর থেকে সন্তানদের দেখাশোনা একাই করেছেন। ছেলেমেয়েরা ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত এখন। প্রতিবছর শীতে তাঁদের কাছে ঢাকায় বেড়াতে আসতেন বদির উদ্দিন।