একসময় সাংবাদিকতা ছিল সত্য, ন্যায় ও সাহসিকতার প্রতীক। কলম ছিল প্রতিবাদের সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র। কিন্তু আজ বাস্তবতা ব্যাপকভাবে বদলে গেছে। ইউটিউব সাবস্ক্রাইবার, টিকটক ফলোয়ার আর ‘লাইভ চলছে’ সংস্কৃতির ভিড়ে প্রকৃত সাংবাদিকতা হারাতে বসেছে। বাহারি কার্ড আর ক্যামেরার ঝলকানিতে ভেতরের ভেজাল চাপা পড়ে যাচ্ছে।
এখন হাতে মোবাইল বা গলায় কার্ড ঝুললেই অনেকেই সাংবাদিক সেজে বসে। চায়ের দোকানের পাশেই গজিয়ে উঠছে ‘ক্রাইম রিপোর্টার অফিস’ অথবা ‘জেলা প্রতিনিধি রুম’। ব্যানারে ঝুলছে বড় বড় পদবী—কোথা থেকে আসে এসব পদ? কী যোগ্যতায় পাওয়া যায়? কোনো উত্তর নেই। কারণ এদের উদ্দেশ্য সাংবাদিকতা নয়—চাঁদাবাজি, ব্ল্যাকমেইলিং ও প্রভাব খাটানো।
কিছু তথাকথিত মিডিয়া মালিক প্রেস কার্ডকে ব্যবসায় পরিণত করেছেন। চলছে কার্ড-বাণিজ্য—“প্যাকেজ নিন, পদ পান।” বানানভুলে ভরা কার্ড হাতে নিয়েই কেউ নিজেকে ‘চিফ এডিটর’ বা ‘ইনভেস্টিগেটিভ রিপোর্টার’ পরিচয় দেয়। আর তাদের দৌরাত্ম্যে প্রকৃত সাংবাদিকরা পড়েন বিব্রত ও হয়রানির মুখে।
গতকাল পর্যন্ত কেউ চায়ের দোকানে কাজ করলেও, আজ সে ‘জেলা প্রতিনিধি’। কেউ খুন বা চাঁদাবাজির আসামি—পরদিনই সে ‘মিডিয়া কর্মী’। এদের কারণেই সাধারণ মানুষের চোখে সাংবাদিক মানেই এখন অনেক সময় প্রতারক বা ধান্ধাবাজ—যা সাংবাদিকতার জন্য চরম বিপর্যয়।
অপরাধীরাও আজ সাংবাদিকতার পোশাক পরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। খুনের আসামি কীভাবে চিফ রিপোর্টার হয়? চাঁদাবাজ কীভাবে থানায় ‘মিডিয়া’ পরিচয়ে প্রবেশ করে? অনেক মিডিয়া মালিকই জানেন, তবুও নীরব—কারণ তারাও এ দুষ্টচক্রের অংশ।
অন্যদিকে প্রকৃত সাংবাদিকদের নেই চাকরির নিশ্চয়তা, নেই পর্যাপ্ত সম্মান বা স্যালারি। বরং ভুয়া সাংবাদিকদের কারণে তাদেরকেও সন্দেহের চোখে দেখা হয়। প্রশাসনের কাছেও জবাবদিহি করতে হয়—কারণ এখন সাংবাদিক মানেই বিভ্রান্তিকর এক পরিচয়।
এই অপসাংবাদিকতার পেছনে রয়েছে ব্যক্তিগত স্বার্থ, রাজনৈতিক ছত্রছায়া, প্রশাসনের নীরবতা ও পাঠকের উদাসীনতা। ফলে গড়ে উঠেছে ভয়ংকর দুষ্টচক্র, যা প্রকৃত সাংবাদিকতার মর্যাদা ধ্বংস করছে। মাঠে পরিশ্রম করা নৈতিক সাংবাদিকদের জায়গা দখল করছে ‘স্মার্টফোন হিরো’রা।
শিক্ষাগত যোগ্যতা, প্রশিক্ষণ ও নৈতিকতা ছাড়াই অনেকে ভুঁইফোড় পত্রিকার কার্ড কিনে প্রতারণা চালাচ্ছে—যা সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য বড় হুমকি।
প্রশ্ন রয়ে গেছে—কে রুখবে এই অপসাংবাদিকতার বিস্তার? প্রেস কাউন্সিল জানে, তথ্য মন্ত্রণালয় জানে, প্রশাসনও জানে—তবু নীরব। যেন প্রকৃত সাংবাদিকতাকে ধ্বংস করার এক অদৃশ্য ষড়যন্ত্র চলছে।
সাংবাদিকতার মতো সংবেদনশীল পেশায় যে কাউকে কার্ড দিয়ে রিপোর্টার বানানো যেমন বিপজ্জনক, তেমনি তাদের হাতে সমাজও নিরাপদ নয়। এদের কারণে মানুষ সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতার উপর আস্থা হারাচ্ছে।
এরা সাংবাদিক নয়—সমাজের পরজীবী। এখনই ব্যবস্থা না নিলে, প্রকৃত সাংবাদিকরা ঐক্যবদ্ধ না হলে—মহান এই পেশা দ্রুতই ধ্বংসের দিকে যাবে।
আজকালের কন্ঠ/আর বি