শীত এলেই কবি জীবনানন্দ দাশের সেই চিরচেনা লাইনটি মনে পড়ে,“শীতের সকালে কুয়াশা যখন নামতে থাকে, মনে হয় প্রকৃতি নিজের হৃদয় খুলে দিয়েছে।”
প্রতি বছর শীতের আগমনে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে তৈরি হয় ভিন্ন এক আবহ। শীত পুরোপুরি নামার আগে থেকেই যেন সূচনা হয় তার আগমনী বার্তা। কুয়াশায় মোড়া ভোর, নীরব পথ, শিশিরভেজা ঘাস। সব মিলিয়ে ক্যাম্পাস যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পায়। বিশেষ করে কৃষ্ণচূড়া রোড ও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি গলি শীতের সময়ে আপন সৌন্দর্য আরও বেশি উজ্জ্বল, আরও জীবন্ত হয়ে ওঠে।
ভোরের ক্যাম্পাসে ঢুকতেই চোখে পড়ে কুয়াশার পর্দায় ঢাকা সেই পরিচিত প্রধান ফটক। সারিবদ্ধ গাছের পাতায় লেগে থাকা শিশিরবিন্দু সূর্যের আলোয় চিকচিক করে। নরম রোদের প্রথম কিরণ কুয়াশা ভেদ করে ওঠার চেষ্টা করলেও প্রকৃতি তখনও আধোঘুমে। পাখির ডাক, মামার দোকান থেকে ভেসে আসা চায়ের ধোঁয়া আর ধীর পায়ে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করা শিক্ষার্থীদের দৃশ্য। সব মিলিয়ে শীতের সকালটিকে করে তোলে আরও কাব্যিক।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনার ও সেন্টার ফিল্ডে শীতের সকাল মানেই অন্যরকম একটা নিস্তরঙ্গ সৌন্দর্য। পাতলা কুয়াশার চাদরে ঢাকা প্রাঙ্গণ দেখে মনে হয়, সময়ও যেন ধীরে হাঁটে। দিনের ব্যস্ততার আগে এই শান্ত নীরবতা মনকে তৈরি করে দেয় এক নতুন উদ্যমে। পাহাড়ের উপর স্থাপিত আইন ও প্রকৌশল অনুষদের সামনে দাঁড়ালে মনে হয় সাদা মেঘে আঁকা কোনো নিস্তব্ধ চিত্রকর্ম দেখছি। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের আগমন, ক্লাস শুরুর প্রস্তুতি, সবই তখন একটু ধীর, কিন্তু নিখুঁতভাবে সুন্দর।
শীত এলেই ক্যাম্পাসের বিভিন্ন ক্লাব ও সংগঠনের কার্যক্রমও হয়ে ওঠে আরও প্রাণবন্ত। শীতবস্ত্র বিতরণ, সামাজিক উদ্যোগ কিংবা সাংস্কৃতিক আয়োজনে জমে ওঠে শিক্ষার্থীদের ব্যস্ততা। এসব আয়োজন শুধু পরিবেশকে উষ্ণ করে না, শিক্ষার্থীদের পারস্পরিক বন্ধনকেও শক্ত করে।
শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত হলের আবাসিক শিক্ষার্থী আব্দুল মালেক বলেন, ‘শীত এলে ক্যাম্পাস যেন নতুন করে সাজে। ভোরের সেই নীরবতা আর বন্ধুদের সঙ্গে চায়ের আড্ডা এসবই কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শীতকে অনন্য করে তোলে।’
ব্যবস্থাপনা শিক্ষা বিভাগের শিক্ষার্থী শারমিন আক্তার ঝিলিক শীতের অনুভূতি বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, ‘পাহারতলি রোডে রং চা হাতে বসে কুয়াশায় মোড়া লালন চত্বর আর পাহাড় যখন চোখে পড়ে, সাথে শীতল বাতাস লাগে মুখে—তখন শীত যেন নতুন রঙে হৃদয়ে ধরা দেয়।’
শীতের আগমন তাই শুধু ঋতু পরিবর্তনের বার্তা নয়, এটি কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি শিক্ষার্থীর মনে জাগিয়ে দেয় নতুন অনুভূতি, নতুন অনুপ্রেরণা এবং নতুন কর্মউদ্যম।