ইট–বালি ফেলে অস্থায়ী সংস্কারের নামে কুমিল্লা–সিলেট মহাসড়ক এখন পরিণত হয়েছে মরণফাঁদে। খানাখন্দে ভরা এই গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কে প্রতিদিন ঘটছে ছোট-বড় দুর্ঘটনা। দুর্ভোগে পড়েছেন সাধারণ যাত্রী, চালক ও স্থানীয় ব্যবসায়ীরা।
কুমিল্লার মুরাদনগর, দেবিদ্বার, বুড়িচং ও ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার বিভিন্ন অংশ ঘুরে দেখা গেছে—কালামুড়া ব্রিজ থেকে কোম্পানীগঞ্জ বাজার, দেবিদ্বার পৌরসভা, কংশনগর হয়ে ক্যান্টনমেন্ট পর্যন্ত সড়কের বেহাল অবস্থা। কোথাও কোথাও গর্তে ইট–বালি ফেলে অস্থায়ী সংস্কারের চেষ্টা করা হলেও কয়েক দিনের মধ্যেই তা উঠে গিয়ে তৈরি হচ্ছে আরও গভীর গর্ত।
বৃষ্টির সময় এসব জায়গা কর্দমাক্ত হয়ে যানবাহন চলাচল প্রায় অচল হয়ে পড়ে। শুকনো মৌসুমে ধুলায় দম বন্ধ হওয়ার উপক্রম, আর বর্ষায় কাদা ও পানি জমে যানবাহন চলাচল হয়ে পড়ে চরম ঝুঁকিপূর্ণ। স্থানীয়দের ভাষায়, এখন এই সড়ক দিয়ে যাতায়াত মানে জীবন বাজি রেখে চলা।
কোম্পানীগঞ্জ শ্রমিক শাখার সভাপতি হাজী ইদ্রিস বলেন, “এই সড়কের অবস্থা এখন মৃত্যুফাঁদের মতো। প্রতিদিন গর্তে পড়ে ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান, এমনকি যাত্রীবাহী বাসও বিকল হচ্ছে। শ্রমিকরা ভোর থেকে রাত পর্যন্ত কষ্ট করছে, দুর্ঘটনার ভয় নিয়ে গাড়ি চালানো মানে জীবনের সঙ্গে যুদ্ধ।”
পরিবহন চালক হেলাল মিয়া জানান, আগে এক ঘণ্টার পথ যেতে এখন লাগে তিন ঘণ্টা। “গাড়ি মাঝেমাঝে গর্তে আটকে যায়, যাত্রীরা ভোগান্তিতে পড়ে।”
অন্যদিকে মুরাদনগর উপজেলার কেমিস্ট অ্যান্ড ড্রাগিস্ট সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোঃ সাইফুল ইসলাম খান বলেন, “রাস্তার ধুলায় পুরো বাজার ঢেকে গেছে। ওষুধের দোকানের ভেতরে ধুলা জমে ওষুধ নষ্ট হচ্ছে। প্রতিদিন ধুলো, দুর্গন্ধ আর যানজটে মানুষ হাঁপিয়ে উঠেছে। স্থায়ী সংস্কার না হলে এটি জনস্বাস্থ্যের জন্য ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনবে।”
২০২২ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর তৎকালীন সরকার কুমিল্লার ময়নামতী থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ধরখার পর্যন্ত ৫৪ কিলোমিটার সড়ক চার লেনে উন্নীত করার প্রকল্প অনুমোদন দেয়। প্রস্তাবিত ব্যয় ধরা হয় প্রায় ৭ হাজার ১৮৮ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। বর্তমান ১৮ ফুট প্রশস্ত সড়ক উন্নীত হয়ে হবে প্রায় ৬০ ফুট। উভয় পাশে সার্ভিস লেন, ১৪টি ব্রিজ, একটি ফ্লাইওভার, দুটি আন্ডারপাস, ৫০টি কালভার্ট ও ১২টি ফুটওভারব্রিজ নির্মাণের কথা ছিল।
কিন্তু সেই প্রকল্প এখন কার্যত থমকে আছে। সড়ক ও জনপথ (সওজ) সূত্রে জানা গেছে, ভূমি অধিগ্রহণের কাজ আংশিক সম্পন্ন হলেও বৈদেশিক অর্থায়ন ও প্রশাসনিক জটিলতায় অগ্রগতি ব্যাহত হচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকল্পের দুই পাশে ভূমি অধিগ্রহণের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর ক্ষতিপূরণের আশায় রাতারাতি দোকান ও স্থাপনা গড়ে তোলা হচ্ছে। এতে ভূমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়ায় নতুন জটিলতা তৈরি হয়েছে।
কুমিল্লা সওজ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী খন্দকার গোলাম মোস্তফা বলেন, “মহাসড়কের ক্ষতিগ্রস্ত অংশগুলো চলাচলযোগ্য রাখতে ইট–বালি দিয়ে অস্থায়ী সংস্কার করা হচ্ছে। তবে চার লেন প্রকল্পের ফান্ডিং অনুমোদন পাওয়ার সম্ভাবনা এখন নেই।”
তিনি আরও জানান, গত ১৪ অক্টোবর সওজের ঢাকা কার্যালয়ের একটি কারিগরি দল মহাসড়কটি সরেজমিনে পরিদর্শন করেছে। “আমরা নতুন করে প্রস্তাব তৈরি করে মন্ত্রণালয়ে পাঠাচ্ছি। অনুমোদন পেলে দ্রুত কাজ শুরু করা হবে।”
স্থানীয়দের মতে, কুমিল্লা–সিলেট মহাসড়ক শুধু আঞ্চলিক নয়, এটি দেশের অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক রুট। প্রতিদিন হাজারো যাত্রী ও মালবাহী যান এই পথে চলাচল করে। দ্রুত টেকসই সংস্কার ও চার লেন প্রকল্প বাস্তবায়ন না হলে দুর্ঘটনা, জনদুর্ভোগ এবং অর্থনৈতিক ক্ষতি আরও বাড়বে।
আজকালের কন্ঠ/আর বি