Header
প্রিন্ট তারিখঃ সেপ্টেম্বর ২০, ২০২৬ , ৯:২৮ পূর্বাহ্ণ | প্রকাশের সময়ঃ অক্টোবর ২২, ২০২৫ , ৫:১৯ অপরাহ্ণ

বাকেরগঞ্জ সরকারি কলেজের ছাত্রাবাস এখন মাদক সেবীদের আস্তানা!

লেখকঃ খান মেহেদী

বাকেরগঞ্জ উপজেলায় গত ৩৩ বছরেও চালু হয়নি বাকেরগঞ্জ সরকারি কলেজের ছাত্রাবাসটি। প্রায় ১ কোটি টাকা ব্যয়ে তিনতলা ছাত্রাবাসটি নির্মাণ করা হয় দুর্গম এলাকা থেকে উপজেলা সদরের এই কলেজে পড়তে আসা শিক্ষার্থীদের কথা মাথায় রেখে। তবে এখনো ছাত্রাবাসটির তত্ত্বাবধায়কসহ কোনো পদেই লোকবল নিয়োগ করা হয়নি। এমনকি ছাত্রাবাসটি পরিচালনার দায়িত্ব কোন প্রতিষ্ঠানের হাতে, তাও কেউ জানে না।

তিনতলা ছাত্রাবাসটি এখন পরিত্যক্ত ভবনের রূপ নিয়েছে। আর এই পরিত্যক্ত ভবন মাদকসেবী ও অসামাজিক কর্মকাণ্ডের আখড়ায় পরিণত হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, দিনে ও রাতে ওই ভবনে মাদকসেবন, জুয়া ও নারী-পুরুষের অনৈতিক কার্যকলাপ চলে আসছে দীর্ঘদিন ধরে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে কলেজ ছাত্রাবাসের তিনতলা বিশিষ্ট ওই ভবনটি পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। কলেজ কর্তৃপক্ষ ভবনটি ব্যবহার না করায় বর্তমানে এটি মাদকসেবী ও অসামাজিক কার্যকলাপের নিরাপদ আস্তানায় পরিণত হয়েছে। বর্তমানে ভবনটির প্রতিটি কক্ষে পড়ে আছে মদের বোতল, সিগারেটের খালি প্যাকেট, ইয়াবার আলামত, দিয়াশলাই ও নারীদের পোশাক-পরিচ্ছদ। এসব দেখলেই বোঝা যায় ভবনটিকে এখন মাদকসেবী ও অসামাজিক কার্যকলাপের নিরাপদ আস্তানায় পরিণত করা হয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ১৯৭০ সালে দেশের উত্তাল রাজনৈতিক সংঘাতময় পরিস্থিতিতে এলাকার কিছু শিক্ষানুরাগী ব্যক্তির সাহসী ও প্রশংসনীয় পদক্ষেপে সরকারি বাকেরগঞ্জ কলেজের বীজ বপন করা হয়। ১৯৭৮ সালে সরকারি অর্থে কলেজের অস্থায়ী ঠিকানা পরিবর্তিত হয়ে স্থায়ী ঠিকানায় অবস্থান গ্রহণ করে। ১৯৮৩ সালে নির্মিত হয় মূল ভবন এবং পুরাতন বিজ্ঞান ভবনটি। ১৯৮৯ সালের ২৫ জুলাই সরকারি ঘোষণার মাধ্যমে বাকেরগঞ্জ কলেজটি সরকারি কলেজের মর্যাদা পায়।

১৯৯২ সালে বিএনপি সরকারের আমলে ছাত্রাবাস ভবনটির নির্মাণ কাজ শুরু হয়। উপজেলার দুর্গম এলাকার শিক্ষার্থীদের সুবিধার্থে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রায় ১ কোটি টাকা ব্যয়ে দৃষ্টিনন্দন ছাত্রাবাসটি নির্মাণ করা হয়। তৎকালীন বিএনপি সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার দুই বছরের মাথায় তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন শুরু হয়। তখন তড়িঘড়ি করে ঠিকাদার ভবনটির নির্মাণ কাজ শেষ করেন। জ্বালাও-পোড়াও ধ্বংসাত্মক রাজনীতির পর ১৯৯৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির একতরফা নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সংসদে পাস হলো তত্ত্বাবধায়ক সরকার, কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে ছাত্রাবাস চালু হওয়ার আগেই রাজনৈতিক কারণে তখন চালু না হলেও এখন পর্যন্ত বন্ধ রয়েছে।

বাকেরগঞ্জ বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন সেতুর দক্ষিণ পাশে মহাসড়কের পশ্চিম পাশে সরকারি কলেজের সম্পত্তির উপর এই ছাত্রাবাস অবস্থিত।

২১ অক্টোবর সরেজমিনে দেখা যায়, তিনতলা বিশিষ্ট ছাত্রাবাসটির ভবনের নিরাপত্তার তদারকিতেও কাউকে দেখা যায়নি। তিনতলা ভবনের কয়েকটি কক্ষে ও ছাদের উপর প্রকাশ্যে দেখা যায়, কয়েকজন যুবক মিলে মাদকসেবন করছে। গত ৩৩ বছর খালি পড়ে থাকায় ভবনের দেয়ালের রং বেশ বিবর্ণ হয়ে গেছে। জরাজীর্ণ ভবনের ইট-সুরকি খসে পড়ছে। খসে পড়ছে পলেস্তারও। বের হয়ে গেছে রড। অনেক স্থানেই ফাটল দেখা দিয়েছে। সিলিংজুড়ে স্যাঁতস্যাঁতে অবস্থা। আগাছা জন্মেছে যেখানে-সেখানে। বৃষ্টি হলেই ছাদ থেকে পড়ছে পানি। দরজা-জানালা ও গ্রিল চুরি হয়ে গেছে। ভবনটি এখন পরিত্যক্ত হয়ে গেছে। সন্ধ্যা ঘনালেই পরিত্যক্ত ভবনে মাদককারবারি ও মাদকসেবীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়। সরকারি কলেজের ছাত্রাবাসটি এখন যেন ভূতুড়ে বাড়িতে রূপ নিয়েছে।

এ বিষয়ে কলেজ শিক্ষার্থীরা জানায়, উপজেলার প্রাণকেন্দ্রে একটি মাত্র সরকারি কলেজ। এখানে দূর-দূরান্ত থেকে অনেক শিক্ষার্থী ভর্তি হয়। সবার পক্ষে আসা-যাওয়া করে কলেজ করা প্রতিদিন সম্ভব নয়। ছাত্রদের জন্য ছাত্রাবাস নির্মাণ করা হলেও অজানা কারণেই তা এখনো বন্ধ রয়েছে। ছাত্রাবাসটি চালু হলে অনেক শিক্ষার্থীর দুর্ভোগ লাঘব হবে।

কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ রফিকুল ইসলাম জানান, ৬ একর ৩০ শতাংশ জমির উপর নির্মিত কলেজ ভবন ও ছাত্রাবাস। অথচ ছাত্রাবাস নির্মিত স্থানে সরকারি কলেজের মোট ৫৩ শতাংশ জমি থেকে ২৭ শতাংশ জমি কলেজের নামে রেকর্ড রয়েছে। বাকি ২৬ শতাংশ জমি হাল বিক্রির জরিপে সরকারের নামে রেকর্ডভুক্ত না হয়ে স্থানীয় আব্দুল হাকিম গংদের নামে রেকর্ডভুক্ত হয়। এ বিষয়ে ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনালে ২০১৯ সালে একটি মামলা হয়। আদালতে মামলাটি চলমান রয়েছে। যার মামলা নং—১৭৫৯/১৯। যে কারণে এই মুহূর্তে ছাত্রাবাসটি চালু করাও যাচ্ছে না।

অপরদিকে ছাত্রাবাসের জমি দখল করে দোকানঘর নির্মাণ করে ভাড়া দিয়ে আসছে স্থানীয় একটি সিন্ডিকেট। কর্তৃপক্ষের অবহেলা, উদাসীনতা ও তত্ত্বাবধানের অভাবে সরকারি কলেজ বেহাল দশায় পরিণত হয়েছে।

আজকালের কন্ঠ/আর বি

প্রিন্ট করুন