Header
প্রিন্ট তারিখঃ সেপ্টেম্বর ২১, ২০২৬ , ১:২৩ পূর্বাহ্ণ | প্রকাশের সময়ঃ অক্টোবর ১৯, ২০২৫ , ৪:৫৪ অপরাহ্ণ

তথাকথিত অসাধু এনজিওদের মদদে আমলাতান্ত্রিক ফাঁদে অভিবাসন সেক্টর বিপর্যয়ের মুখে

লেখকঃ আজকালের কন্ঠ ডেস্ক

বাংলাদেশের অন্যতম বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের খাত অভিবাসন সেক্টর বর্তমানে এক ভয়াবহ সঙ্কটের মুখে।তথাকথিত অসাধু এনজিও ও প্রশাসনিক জটিলতার বেড়াজালে, দেশের শ্রমবাজার ও বৈধ অভিবাসন ব্যবস্থাপনা আজ গভীর অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে।

স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশ বিশ্বের প্রায় ১৮০টিরও বেশি দেশে দক্ষ ও অদক্ষ শ্রমিক প্রেরণ করেছে। বর্তমানে পৃথিবীর নানা প্রান্তে প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখেরও বেশি বাংলাদেশি প্রবাসী কর্মরত, যা দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি।

সৌদি আরব এখনো প্রধান শ্রমবাজার

সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশি কর্মী অবস্থান করছেন সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, ওমান, কাতার, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও দক্ষিণ কোরিয়ায়। এর মধ্যে শুধুমাত্র সৌদি আরবে প্রায় ৪০ লক্ষাধিক প্রবাসী কর্মরত আছেন — যা বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় শ্রমবাজার হিসেবে বিবেচিত।

২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত আনুমানিক ৮ লাখেরও বেশি নতুন কর্মী বিদেশে প্রেরণ করা হয়েছে, যা চলমান চ্যালেঞ্জের মধ্যেও একটি ইতিবাচক অগ্রগতি।

রেমিট্যান্সে রেকর্ড প্রবাহ

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রবাসী আয় (রেমিট্যান্স) দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৬–২৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৫–৭% বৃদ্ধি নির্দেশ করে। রেমিট্যান্স বর্তমানে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সবচেয়ে বড় উৎস, যা দেশের মোট রিজার্ভের প্রায় ৪০–৪৫% জোগান দেয় এবং গ্রামীণ অর্থনীতি, ব্যাংকিং সেক্টর ও সামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।

রিক্রুটিং এজেন্সির ভূমিকা উপেক্ষিত

বিশ্লেষকরা মনে করেন, দেশের প্রবাসী শ্রমিক প্রেরণে রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর ভূমিকা অপরিসীম।
রাষ্ট্র যখন অভ্যন্তরীণ কর্মসংস্থানের পর্যাপ্ত সুযোগ তৈরি করতে পারেনি, তখন এই সেক্টরের উদ্যোক্তা, পুরোনো প্রবাসী ও প্রবাসী বিনিয়োগকারীরাই নিজ উদ্যোগে লক্ষ লক্ষ মানুষের বিদেশগমনের পথ তৈরি করেছেন।

কিন্তু দুঃখজনকভাবে এই গুরুত্বপূর্ণ সেক্টরের উদ্যোক্তারা আজ নানা আমলাতান্ত্রিক বাধা, অযৌক্তিক নীতিনির্ধারণ ও প্রজ্ঞাপনের চাপে দিশেহারা। অভিযোগ রয়েছে—কিছু এনজিও ও সুবিধাভোগী মহল, বিদেশি অর্থায়নের ছত্রছায়ায় বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর ভাবমূর্তি নষ্টে তৎপর, যার ফলে দেশের বৈদেশিক শ্রমবাজার সংকুচিত হচ্ছে।

মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে ‘স্লো পয়জনিং’

সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যের প্রায় সব শ্রমবাজারে অচলাবস্থা দেখা দিয়েছে। কেবল সৌদি বাজারই এখনো সক্রিয় থাকলেও, অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে সেটিকেও “স্লো পয়জনিং”-এর মাধ্যমে ধীরে ধীরে অকার্যকর করে তোলার চেষ্টা চলছে।

গত ১৪ মাসে ইন্টেরিম গভর্নমেন্টের সময়ে জারি করা আইন, বিধি, দফা ও পরিপত্র লিগ্যাল মাইগ্রেশনে মারাত্মক প্রভাব ফেলেছে। ফলে বৈধ প্রক্রিয়ায় বিদেশগমন জটিল হয়ে পড়ছে, নিয়োগকর্তারা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন, এবং একই সঙ্গে অবৈধ মাইগ্রেশন আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

অভিবাসন সেক্টর রক্ষায় জরুরি পদক্ষেপ প্রয়োজন

অভিবাসন বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এখনই যদি যথাযথ নীতিমালা ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার না আনা হয়, তাহলে বাংলাদেশ দক্ষ শ্রমবাজার হারানোর মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়বে। বৈদেশিক বাজারে অবস্থান ধরে রাখতে হলে সরকারের উচিত রিক্রুটিং এজেন্সি, প্রবাসী সংগঠন ও সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে যৌথ কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা।

“বাংলাদেশের প্রবাসী কর্মীরা শুধু অর্থনীতিরই নয়, দেশের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও উন্নয়নেরও অন্যতম স্তম্ভ।এখনই যদি দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র মোকাবেলায় সঠিক সিদ্ধান্ত না নেওয়া হয়, তবে ক্ষতির মাত্রা হবে ভয়াবহ।”

মোহাম্মদ মহিউদ্দিন
মানবাধিকার কর্মী ও অভিবাসন বিশ্লেষক।

প্রিন্ট করুন