নওগাঁর রানীনগর উপজেলার কুজাইল বাজারে লক্ষ্মী পূজা উপলক্ষে অনুষ্ঠিত হয় ঐতিহ্যবাহী কুজাইল মেলা। স্থানীয়ভাবে এটি শুধু একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, বরং একটি প্রাচীন সামাজিক ও অর্থনৈতিক উৎসব হিসেবে এখনো গ্রামীণ সংস্কৃতির ধারক-বাহক হয়ে আছে। প্রতিবছর আশ্বিন মাসের পূর্ণিমা তিথি শেষে লক্ষ্মী পূজা উপলক্ষে এই মেলা শুরু হয়, যা টানা তিন থেকে পাঁচ দিনব্যাপী চলে।
স্থানীয় প্রবীণদের ভাষ্যমতে, প্রায় শত বছর আগে কুজাইল এলাকার জমিদারবাড়ির আঙিনায় প্রথম এই মেলার সূচনা হয়। মূলত ধনদেবী লক্ষ্মীর আরাধনার মধ্য দিয়ে গ্রামীণ মানুষের সমৃদ্ধি কামনা এবং নতুন ফসল ঘরে তোলার আনন্দ ভাগাভাগি করতেই মেলার প্রবর্তন। সময়ের বিবর্তনে এখন এটি ধর্মীয় সীমা ছাড়িয়ে একটি সর্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে।
মেলার মাঠে এখন দেখা যায় হরেক রকম পসরা সাজিয়ে বসেছেন ব্যবসায়ীরা। মাটির তৈরি হাঁড়ি-পাতিল, কাঁঠের তৈরি খেলনা, খেলনা, কৃষিজ যন্ত্র, ঘরোয়া সাজসজ্জার সামগ্রী থেকে শুরু করে পোশাক, গয়না, মিষ্টি—সবই পাওয়া যায় একসাথে।
এছাড়াও সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও নাগরদোলার মতো বিনোদনমূলক আয়োজন থাকে, যা দূর-দূরান্তের মানুষকে আকৃষ্ট করে।
লক্ষ্মী দেবীর পূজাকে ঘিরে গৃহস্থদের ঘরে ঘরে পূজা ও আরাধনা অনুষ্ঠিত হয়। এরপর পরিবার-পরিজন নিয়ে সবাই মেলায় আসে। অনেকেই বলেন, “এই মেলা আমাদের জীবনের আনন্দের উৎস। ধর্মীয় পূজার পাশাপাশি এটি আমাদের মিলনমেলা।”
মেলাকে ঘিরে রানীনগর উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়। টহল দল এবং স্বেচ্ছাসেবী দল মাঠে কাজ করে যাতে কোনো অঘটন না ঘটে।
এই মেলাকে কেন্দ্র করে আশপাশের এলাকার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা বছরে একবার ভালো বিক্রি করতে পারেন। স্থানীয় হস্তশিল্পীরা তাদের পণ্য বিক্রির সুযোগ পান, যা গ্রামীণ অর্থনীতিতে প্রাণ সঞ্চার করে।
এক কথায় কুজাইল বাজারের লক্ষ্মী পূজার মেলা শুধু একটি ধর্মীয় আয়োজন নয়, এটি গ্রামীণ বাংলার ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও সম্প্রীতির প্রতীক। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আধুনিকতার ছোঁয়া এলেও, এই মেলার গ্রামীণ আবহ এখনো অটুট আছে—যা নতুন প্রজন্মের কাছে ঐতিহ্যের এক জীবন্ত পাঠশালা।