Header
প্রিন্ট তারিখঃ সেপ্টেম্বর ২০, ২০২৬ , ৯:৩৫ অপরাহ্ণ | প্রকাশের সময়ঃ আগস্ট ৭, ২০২৫ , ৫:০২ অপরাহ্ণ

নিখোঁজের আট মাস পর মায়ের কোলে হোসাইন-মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছেন হোসাইনের প্রিয় নানী মনোয়ারা

লেখকঃ আজকালের কণ্ঠ

শাহ সাহিদ উদ্দিন, কুমিল্লা জেলা প্রতিনিধি : চার বছরের শিশু হোসাইনের মুখে আজ হাসি। আট মাস পর সে ফিরেছে তার প্রিয় মায়ের কোলেপিঠে। কিন্তু এই ফিরে পাওয়া আনন্দের মুহূর্তে এক কোণায় কান্না চাপা দিচ্ছে সবাই—কারণ মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছেন হোসাইনের প্রিয় নানী মনোয়ারা বেগম।

একটি শিশু, একটি মা, একটি পরিবার—হারিয়ে গিয়েছিলো জীবনের স্রোতে। এখন তারা ফিরে এসেছে, তবে কত বড় মূল্য দিয়ে!

চার বছরের হোসাইন মা জরিনার সঙ্গে থাকতো নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জের উড়িরচরে। বাবার নাম আলমগীর হোসেন, যিনি চট্টগ্রামে থাকতেন। একদিন হঠাৎ করেই আর যোগাযোগ রাখলেন না তিনি। খোঁজ নিতে গিয়ে জানা গেল, তিনি নতুন সংসার গড়েছেন। স্বামীর এই বিচ্ছেদ মানতে না পেরে স্ত্রী জরিনা একমাত্র সন্তানকে নিয়ে রওনা হন চট্টগ্রামে। উদ্দেশ্য—একবার দেখা হোক, উত্তর খোঁজা হোক।

ট্রেনে উঠেছিলো মা-ছেলে। কিন্তু ট্রেন ভুল, গন্তব্য ভুল, আর সেই ভুলেই হারিয়ে যায় হোসাইন। লাকসাম স্টেশনে তিন অপহরণকারী তাকে নামিয়ে নেয়। মা তখন খুঁজতে খুঁজতে চলে যান ঢাকা। ফিরে এসে পান না ছেলেকে, না স্বামীকে। ভেঙে পড়েন জরিনা। একেবারে নিঃস্ব হয়ে যান।
লাকসামে অপহরণকারীদের কবলে থাকা হোসাইনকে যখন রাস্তায় কান্না করতে দেখা যায়, তখন পুলিশের সহায়তায় ১৪ ডিসেম্বর তাকে আশ্রয় দেওয়া হয় দেবিদ্বার সরকারি শিশু পরিবারে। সেখানে নির্জন জীবনে কেটে যায় দীর্ঘ আটটি মাস।

তবে আশা ফুরোয় না। স্থানীয় সাংবাদিক মো. আক্তার হোসেন ও তার টিম সদস্য পারভেজ, আনোয়ার, আবুবকর, জহিরুল ইসলাম মারুফ সংবাদপত্র ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হোসাইনের ছবি ও তথ্য ছড়িয়ে দেন। অবশেষে ১ আগস্ট সন্ধান মেলে হোসাইনের পরিবারের। পরদিন ভিডিও কলে কথা হয় মা-ছেলের।

৩ আগস্ট দেবিদ্বার যাওয়ার পথে হোসাইনের মা জরিনা, নানী মনোয়ারা বেগম এবং মামা অলিউল্লাহ এক ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হন। সেই একই সিএনজিতে থাকা ওমান প্রবাসী মো. ইব্রাহিম ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান, তার ছোট বোন ফারজানা আক্তার(১৯) তার স্বামী হৃদয় মধ্য প্রাচ্যে থাকেন। ফারজানার কোমরের নিচের অংশ দুই গাড়ির চাপায় চুর্ণবিচুর্ণ হয়ে যায়। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে ঢাকা রাজারবাগ বি-বারাকা হসপিটালে ভর্তি করা হয়। তার অবস্থা সংকটাপন্ন।

সাংবাদিকদের তৎপরতায় হোসাইনের পরিবারের ৩ জন আহতকে কুমিল্লা মেডিকেলে ভর্তি করা হয়। পরে নানি মনোয়ারা বেগমের অবস্থা সংকটাপন্ন হলে ঢাকায় পাঠানো হয় এবং বর্তমানে তিনি মাতুয়াইলে একটি বেসরকারি হাসপাতালের আইসিইউতে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন।

আর ঠিক সেই একই দিনে—বুধবার, ৬ আগস্ট—এক হৃদয়স্পর্শী দৃশ্যের জন্ম হয়। কুমিল্লা মেডিকেল থেকে সুস্থ হয়ে ফিরে আসেন হোসাইনের মা জরিনা। দুপুরে দেবিদ্বার শিশু পরিবারে আসেন ছেলেকে নিতে। উপস্থিত ছিলেন ইউএনও মোহাম্মদ আবুল হাসনাত খাঁন, সাংবাদিক, স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ। তখনই মা জরিনার কোলে ফিরিয়ে দেওয়া হয় হোসাইনকে। আবেগে কেঁপে ওঠে চারপাশ। মায়ের চোখে জল, সন্তানের মুখে হাসি।

দৈনিক যুগান্তর দেবিদ্বার প্রতিনিধি সাংবাদিক মোঃ আক্তার হোসেন জানান, গত এক মাস পূর্বে হোসাইনের পরিবারের সন্ধ্যান পেতে কাজ শুরু করেন স্থানীয় কয়েজন সাংবাদিককে সাথে নিয়ে। বিভিন্ন পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশসহ সোশ্যাল মিডিয়া প্রচার প্রচারনা শুরু করেন তারা।

গত ১ আগষ্ট তারা হোসাইনের পরিবারে সন্ধ্যান পান। তিনি আরো বলেন, তাদের চিকিৎসা খরচ দানে যারা সহযোগীতার হাত বাড়িয়েছেন তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ। এ মানবিক সহযোগীদের সহায়তা না পেলে এত বড় ব্যয় বহুল চকিৎসা করা সম্ভব ছিলনা।

জরিনা বলেন, “সবাইকে ধন্যবাদ জানাই। সাংবাদিকদের কারণে আজ আমার হোসাইনকে ফিরে পেয়েছি। তারাই আমার মায়ের চিকিৎসা চালিয়ে যাচ্ছেন।”

দেবিদ্বার সরকারি শিশু পরিবারের তত্ববধায়ক বরুন চন্দ্র দে বলেন, হোসাইন খুবই শান্ত ও একজন ভালো ছেলে, সে আমাদের শিশু পরিবারে প্রায় আট মাস ধরে ছিল। গত বছরের ১৪ ডিসেম্বর হোসাইনকে লাকসাম পুলিশ দিয়ে যান। সাংবাদিক আক্তার হোসেনের সহ কয়েকজন সাংবাদিকের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে সন্ধ্যান মিলে হোসাইনের পরিবারের। তার পরিবারের পরিচয় নিশ্চিত হয়ে মায়ের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয় হোসাইনকে। তাকে তার মায়ের কাছে ফিরিয়ে দিতে পেরে আমরা খুবআ আনন্দিত।

এ ব্যাপারে দেবিদ্বার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আবুল হাসনাত খাঁন বলেন, দেবিদ্বার সরকারি শিশু পরিবারে আশ্রয় প্রাপ্ত হোসাইনের মা এবং তার নানা এসে আবেদন করলে আমরা হোসাইনকে তাদের নিকট তুলে দেই। এর আগে গত ৩ তারিখ মা ও নানী সহ তিনজন দেবিদ্বারে আশার পথে সড়ক দূর্ঘটনায় মারাত্বক ভাবে আহত হন। সাংবাদিক আক্তার হোসেনের নেতৃত্বে স্থানীয় সাংবাদিকরা তাদের উদ্ধার করে চিকিৎসা সেবা দিয়ে তাদের সুস্থ করেন। তবে হোসাইনের নানী এখনো আইসিইউতে চিকিৎসাধীর রয়েছেন। এই দরিদ্র ও অসহায় পরিবারটি পাশে দাড়িয়ে একটি প্রাইভেট হাসপাতলে আইসিইউর খরচ বহন করে তাদের চিকিৎসা চালিয়ে যাচ্ছেন। এটি আমাদের সমাজে একটি দৃষ্টান্ত ও অনুকরনীয় হয়ে থাকবে। আমরা হোসাইনের ব্যাপারে তার পরিবারের সাথে যোগাযোগ রাখবো। তারা যদি দেবিদ্বার বা নিকটস্থ শিশু পরিবারে বাচ্চাটিকে রাখতে চায় তাহলে আমরা সহযোগিতা করবো।

তিনি আরো বলেন, আজ একটি শিশুর ফিরে পাওয়া শুধু এক পরিবারের জন্যই নয়, পুরো সমাজের জন্যই এক আশার আলো। তবে সেই আলো যেন নিভে না যায়—মনোয়ারা বেগম যেন সুস্থ হয়ে নাতিকে বুকে জড়িয়ে ধরতে পারেন—এই প্রার্থনাই এখন আমাদের সবার।

আজকালের কন্ঠ/রাহাত/সাহিদ

প্রিন্ট করুন