নুরুল হাকিম বাপ্পি, কুবি প্রতিনিধি : কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের দাবি ছাত্র সংসদ (কুকসু) গঠনে নেই দৃশ্যমান কোন উদ্যোগ। সর্বশেষ গত ১৬ই জানুয়ারি উপাচার্য বরাবর স্মারকলিপি প্রদান করার পাঁচ মাস পেরিয়ে গেলেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোন পদক্ষেপ না আসায় শিক্ষার্থীদের মাঝে সৃষ্টি হয়েছে উদ্বেগ ও হতাশা।
২০০৬ সালে লাল মাটির বুকে ৫৪ একর জায়গায় জুড়ে প্রতিষ্ঠিত হয় চিরসবুজের এই ক্যাম্পাস। প্রতিষ্ঠার ঊনিশ বছর হয়ে গেলে শিক্ষার্থীদের মুক্তবুদ্ধি চর্চা, রাজনীতি সচেতনতা বৃদ্ধি এবং নিজেদের অধিকার আদায়ের জন্য কোনো প্লাটফর্ম গড়ে উঠেনি এখনো। কাগজ-কলমে রাজনীতি নিষিদ্ধ থাকলেও প্রতিষ্ঠার পর থেকে চলে আসছে ক্ষমতাসীন দলের লেজুড়বৃত্তিক ছাত্ররাজনীতি।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর যখন সিন্ডিকেটে আবারো রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হয় তখন ছাত্র সংসদ প্রতিষ্ঠা এবং নির্বাচন শিক্ষার্থীদের প্রাণের দাবি হয়ে উঠে। কিন্তু প্রশাসনের এমন হঠকারিতা ও উদাসীনতা শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ ও অসন্তোষের জন্ম দিয়েছে।
এদিকে যতোদিন যাচ্ছে, রাজনীতি নিষিদ্ধ ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক ছাত্রসংগঠনগুলোর ক্যাম্পাসভিত্তিক কার্যক্রম বৃদ্ধি পাচ্ছে, বৃদ্ধি পাচ্ছে প্রশাসনিক ভবন থেকে শুরু করে দপ্তরে দপ্তরে ঘুরেবেড়িয়ে দল পাকানোর পায়তারা। ফলে শিক্ষার্থীদের মাঝে দেখা দিয়েছে ছাত্রসংসদ গঠনের অপরিহার্যতা, সঠিক বন্দোবস্তে নেতৃত্ব গড়ে তোলার তীব্র আকাঙ্ক্ষা। তাদের ধারণা, ছাত্রসংসদ ছাড়া সাধারণ শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায় বড়সড় বড় বাঁধার সম্মুখীন হতে পারে।
এর আগে, গত ২৩ ফেব্রুয়ারি এক বক্তব্যে উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো: হায়দার আলী বলেছিলেন, ‘আমরা এখনো কিছু ভাবছি না। নিজে থেকে এখনও কিছু চিন্তা করছি না। অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়েরগুলো দেখছি। তারা যদি কোনো ধরনের ফর্মাল প্রসিডিওর গ্রহণ করে তাহলে আমরাও ভাবব।’
এদিকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাকসু) এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ডাকসু) নির্বাচনের জন্য ইতোমধ্যে তারিখ ঘোষণা ও কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। জাকসু নির্বাচনের তারিখ আগামী ১১ই সেপ্টেম্বর নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবিক পক্ষে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এখনো ছাত্র সংসদ নির্বাচন নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত প্রকাশ করেনি বা আদৌ করবে কিনা এটা নিয়েও নেই নিশ্চয়তা। শিক্ষার্থীরা আশা করছেন, শীঘ্রই প্রশাসন তাদের দাবির প্রতি সাড়া দিয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচনের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।
পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ফারুক নাহিয়ান জানান, ‘কুকসু গঠিত হলে আমাদের সাধারণ শিক্ষার্থীদেরকে আর লেজুড়বৃত্তিক ছাত্ররাজনীতি করতে হবে। গণতান্ত্রিক উপায়ে নিজেদের পছন্দের প্রার্থীকে তারা নির্বাচিত করে তাদের অধিকার আদায় করতে পারবে। কিন্তু দুঃখের বিষয় হচ্ছে এখনো অনেক শিক্ষার্থী কুকসু কি এবং কেন প্রয়োজন সে সম্পর্কে অসচেতন। কুকসু নিয়ে আমাদের শিক্ষার্থীদের সচেতন হতে হবে এবং আমি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে অনুরোধ করব আইনি জটিলতা থাকলেও তা কাটিয়ে দ্রুত কুকসু গঠন করে শিক্ষার্থীদের দাবি মেনে নিন।’
আইন বিভাগের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের আরেক শিক্ষার্থী মেহেরুন্নেছা আশা জানান, ‘ছাত্র সংসদ সাধারণ শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ের অন্যতম প্লাটফর্ম। জুলাই অভ্যুত্থান পরবর্তীতে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অন্যতম একটি চাওয়া ছিল কুকসু নির্বাচন। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হচ্ছে এ বিষয়ে প্রশাসন এখনো কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। আমি জানি না কেন প্রশাসন শিক্ষার্থীদের দাবি মেনে নিতে বিলম্ব করতেছে। তবে, আমি আশা করি অতি শীঘ্রই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সাধারণ শিক্ষার্থীদের প্রাণের দাবি মেনে নিয়ে কুকসু গঠন করবে।’
এ বিষয়ে ফার্মেসি বিভাগের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী নাঈম ভুইঁয়া বলেন, ‘কুকসু কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের প্রধান দাবি হয়ে উঠেছে। যেখানে যায় শিক্ষার্থীদের একটাই চাওয়া কুকসু প্রতিষ্ঠা হোক। কিন্তু আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় প্রসাসনের এই বিষয়ে কোনো অগ্রগতি নাই। এদিকে আমরা যদি ডাকসু অথবা জাকসু পাশাপাশি আরো কয়েকটার দিকে তাকাই এই গুলোর অনেকটাই অগ্রগতি কিন্তু আমাদের কোনো অগ্রগতি দেখি না। আশা করবো বিশ্ববিদ্যালয় প্রসাসন এই বিষয়ে খুব দ্রুত উদ্যোগ নিবেন।’
আবার ছাত্র সংসদ নির্বাচনের ব্যাপারে ক্যাম্পাসের রাজনৈতিক সংগঠনগুলো মধ্যে দেখা যাচ্ছে ভিন্নমত। কেউ বলছে, আগে ছাত্ররাজনীতি পুনরায় চালু হোক, তারপর গণতান্ত্রিক ধারায় কুকসু নেতৃত্ব গঠন। আবার কেউ বলছে, শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক দাবিকে উপেক্ষা করা হলেও শিক্ষকরা ঠিকই তাদের রাজনীতি করে যাচ্ছে। যথাদ্রুত কুকসু নির্বাচনের দাবি জানান তারা।
শাখা ছাত্রদলের সদস্য সচিব মুস্তাফিজুর রহমান শুভ বলেন, ‘ছাত্রদল সবসময় ছাত্র সংসদের পক্ষে। তবে, ক্যাম্পাসে আগে ছাত্ররাজনীতি উন্মুক্ত করতে হবে। ক্যাম্পাসে অনেকেই গুপ্ত রাজনীতি করে যে ব্যাপারে সাধারণ শিক্ষার্থীরা অনেকে অবগত না। ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ রাখা অবস্থায় ছাত্রসংসদ নির্বাচন দিলে সাধারণ শিক্ষার্থীরা যোগ্য প্রতিনিধি বাচাই করতে পারবে না এবং আমার মনে হয় ক্যাম্পাসে সুষ্ঠুধারার রাজনীতি চালু না করে কুকসু নির্বাচন দিলে সাধারণ শিক্ষার্থীরা তা মেনে নিবে না। তাই প্রশাসনের কাছে অনুরোধ থাকবে ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি উন্মুক্ত করে দ্রুত কুকসু নির্বাচন দেয়ার।’
অন্যদিকে কুবি শাখা ছাত্রশিবিরের সভাপতি হাফেজ ইউসুফ ইসলাহী বলেন, ‘সকল ক্যাম্পাসে ছাত্র সংসদ থাকা জরুরি। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়েও শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ের জন্য ছাত্র সংসদ খুবই দরকার। বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের দোহাই দিয়ে ছাত্র সংসদকে আপোষ করার সুযোগ নাই। কারণ শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ের জন্য এবং শিক্ষার্থীদের হয়ে কথা বলার জন্য অন্যতম প্লাটফর্ম হচ্ছে ছাত্র সংসদ।’
তিনি দুঃখের সহিত বলেন, ‘ছাত্র সংসদ সাধারণ শিক্ষার্থীদের প্রাণের দাবি হলেও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এখনো কার্যকরী কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। রাজনীতি নিষিদ্ধ ক্যাম্পাসে ঠিকই শিক্ষক রাজনীতি চলছে কিন্তু শিক্ষার্থীদেরকে আইনের দোহাই দিয়ে দাবিয়ে রাখা হয়েছে। আমাদের স্পষ্ট বার্তা থাকবে ক্যাম্পাসে যদি কোনো নির্বাচন হয় সেটা হবে ছাত্র সংসদ নির্বাচন।’
এ ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র পরামর্শক ও নির্দেশনা দপ্তরের পরিচালক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল মাহবুব বলেন, ‘শিক্ষার্থীরা এখনো আমাকে এ বিষয়ে অবগত করেনি। তবে, আমি মনে করি শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ের জন্য একটা প্লাটফর্ম থাকা দরকার। যেখানে গণতান্ত্রিক উপায়ে ছাত্র প্রতিনিধি নির্বাচিত হবে। ছাত্র সংসদ প্রতিষ্ঠার জন্য যে আইনি জটিলতাগুলো আছে প্রথমে সেগুলো কাটিয়ে উঠতে হবে। এজন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন একটা কমিটি গঠন করে দিতে পারে।’
তিনি আরো বলেন, ‘এ বিষয় নিয়ে যদি শিক্ষার্থীরা আমার সাথে কথা বলে তাহলে আমার পক্ষ থেকে যতটুকু সহযোগিতা দরকার আমি করব।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোঃ হায়দার আলী বলেন, ‘অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নির্বাচন হলে আমাদের এখানেও হবে। আমরা খুব শীঘ্রই এইটা নিয়ে মিটিং-এ বসবো। সবার সাথে আলোচনা করে দ্রুত সিদ্ধান্ত জানানো হবে।’
আজকালের কন্ঠ/আর বি/হাকিম