মোঃ জাহেদুল ইসলাম রতন, লালমনিরহাট : তামাক প্রসঙ্গ এলেই আমাদের নানা-নানী ও দাদা-দাদীদের কথা মনে পড়ে। মনে পড়ে পানের সাথে জর্দ্দা, সাদা পাতা খাঁওয়া এতটা প্রচলিত ছিল সমাজে যে এর দ্বারা সংঘটিত স্বাস্থ্য সমস্যার কথা মাথায় আসত না।
একসময় এদেশের গ্রাম-গঞ্জে হুককার খুব প্রচলন ছিল। কালক্রমে হু্কার পরিবর্তে মানুষের হাতে চলে আসে বিড়ি-সিগারেট যা মানবদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। আজ বিশ্বের জন্য তামাকজনিত মহামারি মােকাবেলা একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
বিশ্বের উন্নত ও উন্নয়নশীল সকল দেশে জনমৃত্যুর প্রধান একটি কারণ হলাে তামাক ও তামাকজাত পণ্য সেবন। ১৯৮৮ সালে প্রণীত হয় তামাকজাত সাম্গ্রীর বিপণন (নিয়ন্ত্রণ) আইন। এই আইনের বলেই সিগারেট কোম্পানিগুলাে সিগারেটের প্যাকেটে ধূমপান স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর’ শব্দটি লিখতে বাধ্য হয়েছিল।
আন্তর্জাতিক আইনী দলিল বা চুক্তি, যা বিশ্বব্যাপী তামাক এবং তামাকজাত দ্রব্যের ব্যবহারকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য প্রণীত হয়। গত মে ২০০৩ এ জেনেভায় বাংলাদেশের সে সময়ের স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ৫৬তম বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সম্মেলনে ১৯২ টি রাষ্টের প্রতিনিধি কর্তৃক এ চুক্তি অনুমােদিত হয়।
দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে প্রথম দেশ হিসেবে বাংলাদেশ গত ১৬ জুন ২০০৩ তারিখে এই চুক্তিতে স্বাক্ষের করে FCTC বা তামাক নিয়ন্ত্রণ বিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তির মুল উদেশ্য হচ্ছে তামাকজাত পণ্যের ব্যবহার এবং প্রকাশ্য ধূমপানের বিস্তার রােধে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে সংশ্লিষ্ট দেশসমূহকে সহযােগিতা করা। এ দলিলে তামাকের ব্যবহারকে বর্তমান বিশ্বে প্রতিরোেধযােগ্য মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
লালমনিরহাটে প্রচার-প্রচারণা ও সচেতনতার বড্ড অভাবে ক্ষতিকর তামাক চাষ থেকে নিরুৎসাহিত করা যাচ্ছে না তামাক চাষীদের। চাষীরা মনে করে কম খরচে তামাক চাষ লাভজনক। এ ফসল চাষে নিরুৎসাহিত করার তেমন কোনো বাস্তব পদক্ষেপ নেই লালমনিরহাট জেলা সদর উপজেলা সহ পাঁচ উপজেলা প্রশাসনের।
অন্যান্য ফসলের চেয়ে কম খরচে বেশি ফসল ও ভালো দামের পাশাপাশি তামাক প্রক্রিয়াজাতকরণ কোম্পানীগুলোর নানামুখি প্রণোদনায় দিব্যি চলছে তামাক চাষ। এ জেলার প্রায় সব স্থানেই কমবেশী তামাকের চাষ হচ্ছে চোখে পড়ার মতো।তামাকজাত কোম্পানীর প্রলোভনে ও অধিক মুনাফার আশায় তামাক চাষে আগ্রহী হয়ে উঠছেন কৃষকেরা। অধিক টাকা খরচ করে ধানসহ অন্যান্য ফসল চাষে ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় এবং শ্রমিকের অধিক মূল্য হওয়ায় কৃষকরা প্রতি বছর ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। ফলে লাভের আশায় স্বাস্থ্য ঝুঁকি জেনেও তারা তামাক চাষে আগ্রহী হচ্ছে বলে জানিয়েছে কৃষি বিভাগের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
জানা গেছে, লালমনিরহাট জেলার ৫টি উপজেলা (লালমনিরহাট সদর, আদিতমারী, কালীগঞ্জ, হাতীবান্ধা, পাটগ্রাম) তারমধ্যে ২টি পৌরসভা ( লালমনিরহাট – পাটগ্রাম) এবং ৪৫ টি ইউনিয়নে ইতিপূর্বেই তামাক চাষীরা বেডে তামাক বীজ বপন করেছে। যা বর্তমানে রোপণ উপযোগী হয়েছে
লালমনিহাট সদর উপজেলার কুলাঘাট ইউনিয়নের পশ্চিম হাতুড়া এলাকার কৃষক মনির হোসেন বলেন, বিএটিসি সিগারেট কোম্পানীর মাধ্যমে তামাক চাষীদের জন্য প্রতি একর জমিতে বীজ ও নগদ ৩হাজার ৬০০টাকা। সেই সাথে ইসুবি সারের জন্য হাজার টাকার সার আগাম দেওয়া হয়। শুধু তাই নয়, উৎপাদিত তামাক সঠিক মূল্যে কৃষকের বাড়ি থেকে কেনার নিশ্চয়তাও আমরা পাই। যে কারণে এলাকায় রবি মৌসুমের বেড়ে চলেছে তামাকের চাষ।
কৃষকেরা বলছেন, জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের বিধি-নিষেধ না থাকায় গ্রামের কৃষকেরা তামাক চাষ থেকে বিরত থাকছে না। পাশাপাশি সমসাময়িক ধান, গম ও ভুট্টাসহ অন্যান্য ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা গেলে ক্ষতিকর এ ফসলের আবাদ অনেকটাই কমে যাবে। তারা আরও বলছেন, তারা রেডিও টেলিভিশনে ধূমপান স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর শুনেছে কিন্তু তামাক চাষ ক্ষতিকর তা শোনেনি। তামাক জাতীয় দ্রব্য ব্যবহারের ফলে ক্যান্সারসহ মারাত্মক মরণব্যাধি হলেও তামাক চাষ বন্ধে এ জেলায় তেমন কোনো প্রচার-প্রচারণা লক্ষ করা যায়নি।
লালমনিরহাট জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ বলেছে, তামাক চাষ ও সেবন মানবদেহের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। তামাক চাষে কারণে কৃষকদের পাশাপাশি স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে রয়েছেন সাধারণ মানুষ। তামাক পাতার সিগারেট, বিড়ি, খইনি, গুল,ও জর্দাসহ নানা ধরনের নেশাজাতীয় তামাক দ্রব্য সেবন করায় বাড়ছে ক্যান্সার, চর্ম,শ্বাসকষ্ট সহ নানা রোগ।
এ বিষয়ে লালমনিরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ড. মোঃ সাইখুল আরিফিন বলেন, লালমনিরহাটে গত বছর তামাক চাষ করা হয়েছিলো প্রায় নয় হাজার হেক্টরে বেশি জমিতে। এবার তার থেকেও বেশি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে চলতি বছরে।