নিজস্ব প্রতিনিধি : মেয়র আতিকুল ইসলামের জমানায় বিনা দরপত্রে ‘প্রিয়’ ঠিকাদারের হাতে কাজ তুলে দেওয়ার রেওয়াজ ছিল। এতে পছন্দের ঠিকাদার আর সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তার ‘পকেট উন্নয়ন’ হলেও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)। নানামুখী আশকারায় ঠিকাদাররা করতেন মানহীন কাজ। গছিয়ে দিতেন লক্কড়ঝক্কড় যান-যন্ত্রপাতি।
জানা গেছে, ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় ডিএনসিসির অর্ধশতাধিক যানবাহন পুড়িয়ে দেয় বিক্ষোভকারীরা। সম্প্রতি এসব যানবাহন দ্রুত সময়ের মধ্যে কেনার উদ্যোগ নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। তবে শতকোটি টাকার অর্ধশতাধিক গাড়ি যাদের সরবরাহের দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে, তারা যানবাহন বিষয়ে আনাড়ি! এমনকি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানটি অতীতে যেসব যান-যন্ত্রপাতি ডিএনসিসিকে সরবরাহ করেছে, সেগুলোর মান নিয়েও রয়েছে প্রশ্ন।
গেল ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর মেয়র আতিক অধ্যায়ের যবনিকা হলেও ডিএনসিসির পুরোনো অভ্যাসের বদল হয়নি। আগের মতো দরপত্র ছাড়াই অর্ধশতাধিক গাড়ি কেনার ব্যাপারে ডিএনসিসি সব আয়োজন চূড়ান্ত করেছে।
আন্দোলনের সময় বিক্ষোভকারীদের হাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় ডিএনসিসির ৬৭ গাড়ি। এর মধ্যে বর্জ্যবাহী ২৯ গাড়ি পুরোপুরি ভস্মীভূত। কর্মকর্তাদের পাজেরো জিপ পোড়ানো হয় ২১টি। তছনছ করা হয় ১৭ গাড়ি। এসব যানবাহনের মধ্যে ছিল ৩২টি বর্জ্যবাহী ডাম্প ট্রাক এবং আটটি আধুনিক কম্প্যাক্টর। আধুনিক মানের এসব যানবাহন ছিল জাপান থেকে আমদানি করা। যানবাহনগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণে ডিএনসিসির বর্জ্য অপসারণ কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে গাড়ি কেনা জরুরি হয়ে পড়ে। আগে মেকানিক্যাল (যান্ত্রিক) শাখার মাধ্যমে এসব যন্ত্রপাতি কেনা হলেও এবার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের মাধ্যমে নারায়ণগঞ্জ ডকইয়ার্ডের কাছ থেকে এসব সংগ্রহের নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা শাখা।
এ ব্যাপারে ডিএনসিসির প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ ফিদা হাসান বলেন, এমনিতেই ডিএনসিসির যানবাহনের ঘাটতি ছিল। আন্দোলনের সময় গাড়ি পোড়ানোর কারণে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। এ জন্যই ডকইয়ার্ডের মাধ্যমে কেনার ব্যাপারে আলোচনা হয়েছে। আর ডকইয়ার্ড এখন অনেক শক্তিশালী ও দক্ষ প্রতিষ্ঠান। তারা অনেক ভারী যন্ত্রপাতি বানাতে পারে। যারা এটা নিয়ে সমালোচনা করছে, তারা ঠিক বলছে না।
অবশ্য ডিএনসিসির একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ডকইয়ার্ডের কাছ থেকে সংগৃহীত মালপত্র ব্যবহার করে ডিএনসিসি অতীতে কখনোই সন্তুষ্ট হতে পারেনি। ডকইয়ার্ডের মাধ্যমে তৈরি করা শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সামনের ফুট ওভারব্রিজের এস্কেলেটর শুরু থেকেই ধুঁকছে। একদিন ভালো থাকলে পরদিনই সেটি নষ্ট হয়ে যায়। অভিযোগ ওঠে, পুরোনো জিনিসপত্র জোড়াতালি দিয়ে ফুট ওভারব্রিজ তৈরি করায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়। আতিকুল ইসলাম মেয়রের দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার ফুটপাতে এক হাজার স্ট্রিটবিন বসানো হয় ডকইয়ার্ডের মাধ্যমে। মাসখানেকের মধ্যেই সেগুলো ভেঙেচুরে একাকার। এ ছাড়া বিভিন্ন সময় ডকইয়ার্ডের মাধ্যমে নানা মাপের দুই শতাধিক কনটেইনার সংগ্রহ করে ডিএনসিসি। দুই বছরের মধ্যেই সেগুলো ভেঙে যায়। এ ছাড়া বর্জ্য সংগ্রহের জন্য বিভিন্ন সময়ে নেওয়া হাতগাড়ির মান নিয়েও ছিল প্রশ্ন। এসবই ডকইয়ার্ডের কাছ থেকে বিনা দরপত্রে সংগ্রহ করে ডিএনসিসি। সর্বশেষ জলাশয়ের কচুরিপানা পরিষ্কারের জন্য ১০টি যন্ত্র সরবরাহ করে ডকইয়ার্ড। এগুলো শুরু থেকেই বিকল। অথচ একেকটি যন্ত্রের দাম পড়ে পাঁচ কোটি টাকা।
ডিএনসিসির এক কর্মকর্তা বলেন, এক সময় ডকইয়ার্ড কর্তৃপক্ষ নিজেরাই যন্ত্রপাতি বানিয়ে সরবরাহ করত। পরে অন্য প্রতিষ্ঠানকে সাবকন্ট্রাক্ট দিয়ে তারা নিজেদের নামে সরবরাহ শুরু করে। ডিপিএম (ডাইরেক্ট প্রকিউরমেন্ট মেথড) পদ্ধতিতে কেনার কারণে তাদের দেওয়া নির্ধারিত দরেই এসব কিনতে হয়। এতে দামও বেশি পড়ে। মূল্য যাচাই-বাছাইয়েরও কোনো সুযোগ থাকে না। ‘এ’ গ্রেডের পণ্যের বদলে তারা ‘সি’ গ্রেডের পণ্য সরবরাহ করে আসছে বলে ওই কর্মকর্তার অভিযোগ।
ডিএনসিসির আরেক কর্মকর্তা বলেন, যে কোনো কিছু ক্রয়ের ক্ষেত্রে ওটিএম (ওপেন টেন্ডার মেথড) সর্বজনস্বীকৃত। ওটিএমের মাধ্যমে পণ্য কিনলে অনেক প্রতিষ্ঠান দরপত্রে অংশ নিতে পারে। পণ্যের মান যাচাই-বাছাইয়ের সুযোগ থাকে। এতে ভালো ব্র্যান্ড ও ভালো মানের পণ্য নিশ্চিত করা যায়। কিন্তু ডিপিএম পদ্ধতিতে সে সুযোগ থাকে না। তবু আগে ডিএনসিসির কাছে ডিপিএম পদ্ধতিই ‘প্রিয়’ ছিল। এবার গাড়ি কেনার ক্ষেত্রেও একই পথে হাঁটছে ডিএনসিসি। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, ডকইয়ার্ড কোনো গাড়িই তৈরি করে না। কাজেই এ রকম একটি প্রতিষ্ঠানকে শতকোটি টাকার বেশি দামের গুরুত্বপূর্ণ গাড়ি সরবরাহের দায়িত্ব দেওয়ার খবরে ডিএনসিসির অনেক কর্মকর্তা আড়ালে ক্ষোভে ফুঁসছেন।
এ ব্যাপারে ডিএনসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মীর খায়রুল আলম বলেন, ডকইয়ার্ডের ব্যাপারে আলোচনা হয়েছে। তবে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়নি। অতীতে তাদের সরবরাহ করা যান-যন্ত্রপাতির মান সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে দেখব। বিতর্ক থাকলে প্রয়োজনে উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে কেনা হবে। মান নিয়ে আপস করা যাবে না।