ভাঙনের মুখে কুয়াকাটার রক্ষা বাঁধ, টেকসই সমাধানে গ্রোয়েনের দাবি | Daily AjKaler Kontho

ভাঙনের মুখে কুয়াকাটার রক্ষা বাঁধ, টেকসই সমাধানে গ্রোয়েনের দাবি


মোঃ মিজানুর রহমান, কুয়াকাটা (পটুয়াখালী) প্রতিনিধি প্রকাশের সময় : জুলাই ১৪, ২০২৬, ২:০১ অপরাহ্ন
ভাঙনের মুখে কুয়াকাটার রক্ষা বাঁধ, টেকসই সমাধানে গ্রোয়েনের দাবি

দেশের অন্যতম পর্যটনকেন্দ্র কুয়াকাটার সমুদ্রসৈকত ও উপকূলীয় জনপদকে ভাঙনের হাত থেকে রক্ষায় নেওয়া বহুল আলোচিত সৈকত রক্ষা প্রকল্পের কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। শত শত কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত শহর রক্ষা বাঁধ ও সিসি ব্লক স্থাপনের কাজ পুরোপুরি শেষ হওয়ার আগেই বিভিন্ন স্থানে ব্লক সরে গিয়ে গর্তের মত হওয়া, ফাটল সৃষ্টি এবং বড় বড় ফাঁকা তৈরি হওয়ায় প্রকল্পের নির্মাণমান, পরিকল্পনা ও স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও পর্যটনসংশ্লিষ্টরা।

সরেজমিনে দেখা গেছে, কুয়াকাটা চৌরাস্তা থেকে লেম্বুর বন পর্যন্ত প্রায় পাঁচ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে শহর রক্ষা বাঁধের বিভিন্ন অংশে সিসি ব্লক ধসে গেছে। অনেক স্থানে ব্লকের নিচ থেকে মাটি ও বালি সরে গিয়ে বড় ধরনের ফাঁকা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের ইসলামপুর দাখিল মাদরাসা সংলগ্ন সানসেট পয়েন্ট এবং ১ নম্বর ওয়ার্ডের আশিঘর এলাকার অর্কা পল্লী সংলগ্ন অংশে পরিস্থিতি সবচেয়ে উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে।

এদিকে কুয়াকাটা জিরো পয়েন্ট ও পশ্চিম সৈকতকে ভাঙনের হাত থেকে রক্ষায় প্রায় ৭৫৯ কোটি টাকা ব্যয়ে “কুয়াকাটা সৈকত রক্ষা ও উন্নয়ন প্রকল্প” গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হলেও প্রকল্প বাস্তবায়নের আগেই বিদ্যমান সুরক্ষা অবকাঠামোর বিভিন্ন অংশে ক্ষয়ক্ষতির চিত্র স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সমুদ্রের ঢেউ, জোয়ার-ভাটার চাপ এবং তীব্র স্রোতের কারণে সিসি ব্লকের নিচ থেকে মাটি সরে গিয়ে কোথাও ব্লক বসে গেছে, কোথাও হেলে পড়েছে, আবার কোথাও বড় ধরনের ফাটল সৃষ্টি হয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা, ব্যবসায়ী ও পর্যটনসংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, উপকূলীয় এলাকার ভূ-প্রকৃতি, সমুদ্রস্রোতের গতিপ্রকৃতি এবং জোয়ার-ভাটার স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য যথাযথভাবে বিবেচনায় না নিয়েই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে। পাশাপাশি নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার ও পর্যাপ্ত তদারকির অভাবও বর্তমান পরিস্থিতির জন্য দায়ী বলে তাদের দাবি।

কুয়াকাটা পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা জেলে মোহাম্মদ হানিফ বলেন, “বর্ষা মৌসুম শুরু হওয়ার আগেই ঝুঁকিপূর্ণ অংশগুলো মেরামতের উদ্যোগ নেওয়া উচিত ছিল। গত বছর একটি স্থানে ব্লক সরে গিয়েছিল, এবার আরও কয়েকটি স্থানে একই সমস্যা দেখা দিয়েছে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।”

ইসলামপুর দাখিল মাদরাসার সুপার সৈয়দ মো. ফারুক বলেন, “অতীতে সমুদ্রের ভাঙনে বেড়িবাঁধের বাইরের অন্তত ১০টি স্থান বিলীন হয়ে গেছে। এখন বাঁধের ভেতরে থাকা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বসতবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানও ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত অংশ দ্রুত সংস্কার করা জরুরি।”

কুয়াকাটা হোটেল-মোটেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আব্দুল মোতালেব শরীফ বলেন, “শহর রক্ষা বাঁধের ভেতরে শত শত হোটেল-মোটেল, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও বসতবাড়ি রয়েছে। বর্ষা ও বৈরী আবহাওয়ার আগে ক্ষতিগ্রস্ত অংশগুলো টেকসইভাবে সংস্কার না করলে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।”

ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচি (সিপিপি) লতাচাপলী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শফিকুল আলম বলেন, আন্ধারমানিক ও রামনাবাদ নদীর পানিপ্রবাহের গতিপথ বৈজ্ঞানিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা গেলে কুয়াকাটার ভাঙন অনেকাংশে কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে নদীর নাব্যতা বৃদ্ধি পাবে, যা পায়রা বন্দরের কার্যক্রম সম্প্রসারণ এবং শিল্পকারখানার বিকাশেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। তাঁর মতে, কুয়াকাটার দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষার জন্য গ্রোয়েন বাঁধ নির্মাণের বিকল্প নেই।

স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, শুধুমাত্র সিসি ব্লক স্থাপন কিংবা বারবার সংস্কার করে কুয়াকাটাকে দীর্ঘমেয়াদে রক্ষা করা সম্ভব নয়। সমুদ্রস্রোত, পলি জমা, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং উপকূলের স্বাভাবিক গতিপ্রকৃতি বিবেচনায় নিয়ে সমন্বিত ও টেকসই উপকূল ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। অন্যথায় বিপুল অর্থ ব্যয়ে নির্মিত অবকাঠামো অল্প সময়ের মধ্যেই আবারও ভাঙনের মুখে পড়বে।

তাদের দাবি, ক্ষতিগ্রস্ত অংশের জরুরি সংস্কার, নির্মাণমানের কারিগরি তদন্ত এবং দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হিসেবে গ্রোয়েন বাঁধ নির্মাণে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এবং পটুয়াখালী-৪ আসনের সংসদ সদস্যের কার্যকর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন কুয়াকাটাবাসী।

স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হলে কুয়াকাটার জিরো পয়েন্ট, পশ্চিম সৈকত, পর্যটন অবকাঠামো এবং উপকূলীয় জনপদ ভবিষ্যতে বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়তে পারে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, ২০১০ সালের দিকে জিও ব্যাগের মাধ্যমে কুয়াকাটা শহর রক্ষা বাঁধের প্রাথমিক কাজ শুরু হয়। পরবর্তীতে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধানে কোস্টাল এমব্যাংকমেন্ট ইমপ্রুভমেন্ট প্রজেক্ট (সিইআইপি-১) এর আওতায় ২০১৭ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে পোল্ডার-৪৮ প্রকল্পের অধীনে প্রায় ৪৩ কিলোমিটার বাঁধ-কাম-সড়ক এবং স্লোপ প্রটেকশন নির্মাণ করা হয়।

এ বিষয়ে কলাপাড়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শাহ আলম বলেন, “কুয়াকাটা সৈকতের ১১ দশমিক ২ কিলোমিটার এলাকায় দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে প্রায় ৭৫৯ কোটি টাকার একটি প্রকল্প ২০২৪ সালে প্রস্তাব করা হয়েছে, যা বর্তমানে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। পাশাপাশি সৈকত ভাঙন রোধে বিকল্প আরও কিছু পরিকল্পনা নিয়েও কাজ চলছে। শহর রক্ষা বাঁধের বিভিন্ন স্থানে ব্লক সরে যাওয়া ও ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে এবং দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা চলছে।”

আজকালের কন্ঠ/আর বি