
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় (কুবি) ক্যাম্পাসে হাঁটলে চোখে পড়ে নানা ধরনের স্টল। কোথাও পোশাক, কোথাও বই, আবার কোথাও খাবার কিংবা কসমেটিকস। এসবের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের নিজেদের তৈরি পণ্যও বিক্রি হতে দেখা যায়। পড়াশোনার পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের একটি অংশ এখন যুক্ত হচ্ছেন উদ্যোক্তা কার্যক্রমে। সেই তালিকায় এবার যুক্ত হয়েছেন মার্কেটিং বিভাগের তিন বন্ধু, যাদের উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার গল্পের শুরুটা হয়েছিল একটি কোর্সের অ্যাসাইনমেন্ট দিয়ে।
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের ২০২৩–২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মো. ইয়ামিন আহমেদ, মো. আশরাফুল ইসলাম ও মো. পারভেজ সরকার তিন বন্ধু মিলে শুরু করেছেন ‘মডেক্স লেদার অ্যান্ড ফুটওয়্যার’। একটি একাডেমিক কাজ করতে গিয়ে বাংলাদেশের চামড়া শিল্প সম্পর্কে আগ্রহ তৈরি হয় তাদের। সেই আগ্রহ থেকেই ধীরে ধীরে বাস্তব ব্যবসায়িক উদ্যোগের ভাবনা আসে।
উদ্যোক্তারা জানান, ‘প্রিন্সিপলস অব মার্কেটিং’ কোর্সের ‘নিউ প্রোডাক্ট ডেভেলপমেন্ট’ অ্যাসাইনমেন্টে নতুন একটি পণ্য নিয়ে কাজ করার সুযোগ আসে। তখন তারা লেদারের জুতা নিয়ে কাজ করার সিদ্ধান্ত নেন। অ্যাসাইনমেন্টের কাজ করতে গিয়ে বাংলাদেশের চামড়া শিল্প, এর সম্ভাবনা এবং বাজার সম্পর্কে জানার আগ্রহ তৈরি হয় তাদের মধ্যে। শুরুতে বিষয়টি কেবল একাডেমিক কাজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। পরে সেটিই বাস্তব উদ্যোগে রূপ নেওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করে।
বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্যে চামড়া, চামড়াজাত পণ্য ও ফুটওয়্যার গুরুত্বপূর্ণ একটি খাত। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) ২০২৩–২৪ অর্থবছরের তথ্য অনুযায়ী, ওই অর্থবছরে ফুটওয়্যার থেকে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় ছিল প্রায় ৯৬০ দশমিক ৮৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। একই সময়ে ফুটওয়্যার বাদে লেদার ও লেদার প্রোডাক্টস থেকে রপ্তানি আয় ছিল প্রায় ৪৯৯ দশমিক ১৩ মিলিয়ন ডলার।
উদ্যোক্তাদের মতে, বাংলাদেশের চামড়া শিল্পের সম্ভাবনা শুধু কাঁচা চামড়া রপ্তানির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মূল্য সংযোজনের মাধ্যমে জুতা, ব্যাগ, বেল্টসহ বিভিন্ন ফিনিশড লেদার পণ্য তৈরি করে এ খাতকে আরও এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখা, দক্ষ জনবল তৈরি, কমপ্লায়েন্স এবং পরিবেশগত ব্যবস্থাপনাসহ নানা চ্যালেঞ্জও রয়েছে এ শিল্পে।
অ্যাসাইনমেন্টের কাজ করতে গিয়ে বাংলাদেশের চামড়া শিল্পের সম্ভাবনার পাশাপাশি নিজেদের ক্যাম্পাসকেন্দ্রিক কিছু সমস্যাও তাদের নজরে আসে। তাদের পর্যবেক্ষণে, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের আশপাশে মানসম্মত লেদারের জুতার পর্যাপ্ত বিক্রয়কেন্দ্র নেই। ফলে প্রয়োজনের সময় শিক্ষার্থীদের ৯ কিলোমিটার দূরে শহরে গিয়ে জুতা কিনতে হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যস্ত একাডেমিক জীবনে সবসময় ক্যাম্পাসের বাইরে গিয়ে কেনাকাটা করার সুযোগ থাকে না শিক্ষার্থীদের। আবার ভালো মানের জুতা কিনতে গেলে অনেক সময় দামও চলে যায় শিক্ষার্থীদের সামর্থ্যের বাইরে। এই বাস্তবতাই তিন বন্ধুকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে।
তাদের ভাবনায় আসে, শিক্ষার্থীদের কথা মাথায় রেখে যদি মানসম্মত লেদারের জুতা তুলনামূলক সাশ্রয়ী দামে সরবরাহ করা যায়, তাহলে ক্যাম্পাসেই একটি প্রয়োজন পূরণ করা সম্ভব। সেই ভাবনা থেকেই একমাস আগে গত ৬ আগস্ট শুরু হয় ‘মডেক্স লেদার অ্যান্ড ফুটওয়্যার’-এর পথচলা।
তবে তাদের উদ্যোগের লক্ষ্য কেবল পণ্য বিক্রির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বাংলাদেশের চামড়া শিল্পকে কাছ থেকে বোঝার চেষ্টাও করছেন তারা। চামড়া কোথা থেকে সংগ্রহ করা হয়, কীভাবে তা প্রক্রিয়াজাত করা হয় এবং একটি চামড়ার টুকরো কীভাবে ধাপে ধাপে পূর্ণাঙ্গ জুতায় রূপ নেয়, এসব বিষয় নিয়েও কাজ করছেন তারা।
উদ্যোক্তারা মনে করেন, তাদের উদ্যোগটি এখনো ছোট পরিসরের। তবে অভিজ্ঞতা ও বাস্তব কাজের মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে এটিকে আরও বড় পরিসরে নিয়ে যেতে চান তারা। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনকে গুরুত্ব দিয়ে মানসম্মত পণ্য সরবরাহের বিষয়টিও তাদের পরিকল্পনায় রয়েছে।
এ বিষয়ে পারভেজ সরকার বলেন, “আমাদের ‘মডেক্স লেদার অ্যান্ড ফুটওয়্যার’-এর শুরুটা কোনো ব্যবসায়িক পরিকল্পনা দিয়ে নয়, বরং একটি অ্যাসাইনমেন্টের হাত ধরে। ‘প্রিন্সিপলস অব মার্কেটিং’ কোর্সের ‘নিউ প্রোডাক্ট ডেভেলপমেন্ট’ অ্যাসাইনমেন্ট করতে গিয়ে বাংলাদেশের চামড়া শিল্প সম্পর্কে জানার আগ্রহ তৈরি হয়। পরে আমরা ক্যাম্পাসের শিক্ষার্থীদের বাস্তব প্রয়োজনগুলো পর্যবেক্ষণ করি।”
তিনি বলেন, “আমাদের ক্যাম্পাস এলাকায় মানসম্মত লেদারের জুতা সহজে পাওয়া যায় না। আবার ভালো ব্র্যান্ডের পণ্য অনেক সময় শিক্ষার্থীদের বাজেটের বাইরে চলে যায়। তাই আমরা এমন একটি উদ্যোগের কথা ভাবি, যেখানে শিক্ষার্থীরা স্টুডেন্ট-ফ্রেন্ডলি বাজেটের মধ্যে মানসম্মত পণ্য পাবে। আমরা শুধু পণ্য বিক্রি করতে চাই না, বরং বাংলাদেশের চামড়া শিল্পকে কাছ থেকে বুঝতে চাই এবং ভবিষ্যতে এই উদ্যোগকে আরও বড় পরিসরে নিয়ে যেতে চাই।”
একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাসাইনমেন্ট থেকে শুরু হওয়া এই উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, তা সময়ই বলে দেবে। তবে তিন বন্ধুর উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার গল্পের শুরুটা হয়েছে খুব সাধারণ একটি জায়গা থেকে। আর সেই ছোট প্রয়োজন থেকেই তৈরি হয়েছে বড় স্বপ্ন দেখার সাহস।
আজকালের কন্ঠ/আর বি
আপনার মতামত লিখুন :