শনিবার, ১৭ এপ্রিল ২০২১ । ৪ বৈশাখ ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

দুর্নীতি না থামলে দুর্দিন আসন্ন

নিউজটি শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

নিজস্ব প্রতিবেদক : জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৫ সালে বলেছিলেন, ‘আজকে করাপশনের কথা বলতে হয়। এই বাংলার মাটি থেকে করাপশন উৎখাত করতে হবে। করাপশন আমার বাংলার কৃষকরা করে না। করাপশন আমার বাংলার মজদুর করে না। করাপশন করি আমরা শিক্ষিত সমাজ, যারা আজকে ওদের টাকা দিয়ে লেখাপড়া করেছি। আজ যেখানে যাবেন, করাপশন দেখবেন। আমাদের রাস্তা খুঁড়তে যান-করাপশন। খাদ্য কিনতে যান-করাপশন। জিনিস কিনতে যান-করাপশন। বিদেশে গেলে টাকার ওপর করাপশন। তারা কারা?’

আমাদের দেশের প্রধান সমস্যা দারিদ্র্য নয়, দুর্নীতি। দেশের প্রতিটি ক্ষেত্রে আজ দুর্নীতি। অনস্বীকার্য যে, আধুনিক বাংলাদেশ বিনির্মাণে অনেক সৎ রাজনীতিক, ব্যবসায়ী ও সরকারি আমলার রক্ত-ঘামও যুক্ত হয়েছে। তব্ওু অভিযোগ রয়েছে, কিছু রাজনৈতিক নেতা, ব্যবসায়ী ও আমলার যোগসাজশে সৃষ্টি হওয়া সিন্ডিকেট বিভিন্ন অনিয়মের সঙ্গে জড়িত। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কোনো কোনো উন্নয়ন প্রকল্পে যেনতেন কাজ করে অর্থ উত্তোলন করা হয়। এমনকি কাজ না করে শুধু পেপার ওয়ার্ক দেখিয়ে অর্থ তুলে নেয়ার ঘটনাও ঘটে। এসব অনিয়ম কেবল রাজনৈতিক নেতা বা ঠিকাদার এককভাবে সম্পন্ন করতে পারে না; সরকারি কর্মচারীদের সঙ্গে আঁতাত ছাড়া তা সম্ভব নয়। আর রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় ছাড়া সরকারি কর্মচারীদের পক্ষেও দুর্নীতি করা অনেক কঠিন। রাজনৈতিক নেতাদের জবাবদিহির ব্যবস্থা রয়েছে, প্রতি পাঁচ বছর পরপর নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের আস্থা অর্জন করে আসতে হয়। কিন্তু একজন সরকারি কর্মচারীকে জনগণের সমথর্ন আদায় করে চাকরিতে টিকে থাকার দরকার হয় না। কোনো সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হলে স্থায়ীভাবে চাকরিচ্যুত করতে হবে এবং দুদকে অভিযোগ দিতে হবে, মামলা করতে হবে। অভিযোগ প্রমাণের পরও যদি অভিযুক্তকে বদলি বা ওএসডি করা হয় অথবা সদর দফতরে নিয়ে যাওয়া হয়, তাহলে তা শাস্তি বলে বিবেচিত হতে পারে না।

বঙ্গবন্ধু ‘আমার দেখা নয়াচীন’ বইয়ে বলেছেন, ঘুষ খাওয়ার অপরাধে সরকারি কর্মচারীর ফাঁসি হয়েছিল। সেই থেকে কর্মচারীদের মধ্যে ভয়ের সঞ্চার হয়েছে। কেউই ঘুষ খেতে সাহস পায় না (পৃষ্ঠা ৯০)। তিনি আরও উল্লেখ করেছেন, চীনের প্রেসিডেন্ট মাও সে তুং-এর বন্ধু দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত হলে তিনি কোনো হস্তক্ষেপ করেননি এবং তার ফাঁসি হয় (পৃষ্ঠা ১০৪)।

গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘পিপলস অ্যান্ড পলিটিক্স’ প্রণীত বিশ্বের সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন ও সৎ সরকারপ্রধানদের এক তালিকায় ১৭৩টি দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানের মধ্যে তৃতীয় স্থানে আছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। মেধা, যোগ্যতা, দক্ষতা ও সততার সঙ্গে দেশ পরিচালনা করে শুধু বাংলাদেশের ইতিহাসে নয়, সমগ্র দক্ষিণ এশিয়া ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে তিনি ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। বাংলাদেশ আজ একটি সম্ভাবনার নাম। এডিবির ‘কি ইনডিকেটরস ফর এশিয়া অ্যান্ড দ্য প্যাসিফিক’ শীর্ষক প্রতিবেদনে ২০১৮ সালে বাংলাদেশকে এশীয় ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ১৩তম বৃহৎ অর্থনীতির দেশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের সহজ ব্যবসা সূচক বা ‘ইজ অব ডুয়িং বিজনেসে’ সবচেয়ে বেশি উন্নতি করেছে এমন ২০টি দেশের তালিকায় বাংলাদেশও আছে। এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট আউটলুক (এডিও) ২০১৯-এ বলা হয়েছে, বাংলাদেশের অর্থনীতির দ্রুততম প্রবৃদ্ধি হয়েছে ২০১৮ সালে, ৭.৯০ শতাংশ। এটি এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের ৪৫টি অর্থনীতির মধ্যে অন্যতম।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর ইকোনমিকস অ্যান্ড বিজনেস রিসার্চ (সিইবিআর) কর্তৃক প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০৩২ সালের মধ্যে বাংলাদেশের বিশ্বের বড় ২৫টি অর্থনীতির দেশের একটি হওয়ার সম্ভাবনা বেশ উজ্জ্বল। তখন বাংলাদেশ হবে বিশ্বের ২৪তম বৃহৎ অর্থনীতির দেশ। আশা করা হচ্ছে, ২০৩৩ সালে আমাদের পেছনে থাকবে মালয়েশিয়া, সুইডেন, সুইজারল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, ভিয়েতনাম ও দক্ষিণ আফ্রিকার মতো দেশ। প্রণিধানযোগ্য, মহামারীর এই সংকটকালেও বাংলাদেশ ব্যাংকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে নতুন রেকর্ড সৃষ্টি হয়েছে। এসব মানদণ্ড বাংলাদেশের বর্ধনশীল অর্থনীতির উজ্জ্বল দিকই নির্দেশ করে।

এসব ইতিবাচক দিকের পাশাপাশি নেতিবাচক খবর হল, অর্থ পাচারে বিশ্বের শীর্ষ ৩০ দেশের তালিকায় রয়েছে বাংলাদেশ। দেশ থেকে বছর বছর পাচার হয়েছে প্রায় বিপুল পরিমাণ অর্থ। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ কোটি টাকার উপরে। দুঃখজনক এই যে, আমাদের দেশের কিছুসংখ্যক দায়িত্বশীল ব্যক্তি ভবিষ্যৎ প্রজন্ম বলতে নিজেদের সন্তান ও পরিবারের সদস্যদের বোঝেন, জনগণ নয়। তাই তারা নিশ্চিত জীবনের আশায় দেশের মায়া ত্যাগ করে জনগণের টাকা কানাডা, মালয়েশিয়াসহ বহু দেশে পাচার করে সেকেন্ড হোম বানিয়েছেন!

নিউইয়র্কে এক নাগরিক সংবর্ধনায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘আমরা ব্যাপকভাবে উন্নয়ন প্রকল্প নিচ্ছি। যে পরিমাণ উন্নয়ন প্রকল্প আমরা নিচ্ছি তার প্রতিটি টাকা যদি সঠিকভাবে ব্যয় হতো, ব্যবহার হতো, তবে আজকে বাংলাদেশ আরও অনেক বেশি উন্নত হতে পারত। এখন আমাকে খুঁজে বের করতে হবে এখানে কোথায় লুপহোল, কোথায় ঘাটতিটা, কারা কোথায় কীভাবে এ জায়গাটা ক্ষতিগ্রস্ত করছে।’

সম্প্রতি পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আবদুল মোমেন অর্থ পাচার বিষয়ে যে মন্তব্য করেছেন, তা ভেবে দেখার মতো। তিনি বলেছেন, রাজনীতিবিদরা নন, বিদেশে বেশি অর্থ পাচার করেন সরকারি চাকুরেরা। এ ব্যাপারে তার কাছে তথ্য রয়েছে বলে তিনি জানিয়েছেন।

দেশে দুর্নীতি বৃদ্ধির জন্য আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিও কম দায়ী নয়। দুর্নীতিবাজ ক্ষমতাশালী ব্যক্তিদের সমাজে বর্জন করা হয়েছে, এটা লক্ষ করা যায় না। সমাজে প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গিতে ব্যাপক পরিবর্তন আনা দরকার। সোনার বাংলা গড়তে বঙ্গবন্ধুর দেখানো পথেই আমাদের হাঁটতে হবে। ভুলে গেলে চলবে না, ১৯৭৫ সালের পরের সরকার অপরাধীদের ইনডেমনিটি দেয় এবং পুরস্কৃত করে। তবে আশার কথা, বর্তমানে দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে অভিযান চলছে। এ অভিযান যেন অব্যাহত থাকে সেজন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।

ব্যারিস্টার এবিএম আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ বাশার : ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল

 

Print Friendly, PDF & Email
শেয়ার করুন »

মন্তব্য করুন »